Tuesday, 22 July 2025

শেষ ট্রেনের গল্প নয়!

দ্রুতগামী এই সভ্যতায়, ট্র্যাফিক আর কবিতা ছাড়া শহর এখন আর থমকায় না। তবু, পূর্বাভাসহীন বর্ষা যখন শান্ত বিকেলগুলোয় আজও নেমে আসে মাঝে মাঝে, ঝড়ের মতো আমাদেরকেও ব্যতিক্রম হতেই হয়। ভরপুর জীবনে, আচমকা, থমকাতেই হয় তখন!

হেডফোন বিকল হয়ে যাওয়ার মতো কঠিন ব্যাপার কলেজ লাইফে খুব কমই ঘটে। দূর্ভাগ্যবশতঃ আমার সাথে ঘটল তা-ই। নতুন হেডফোন আসতে হপ্তাখানেক। সম্বল তাই মায়ের তারওয়ালা ইয়ারফোন। যাই হোক, শার্টের পকেটে সেই ইয়ারফোন রেখে দমদম স্টেশনে পৌছে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকতে না পেরে, প্ল্যাটফর্মের কুড়ি টাকার একটা ফিশ ফ্রাই খেতে লাগি (কুড়ি টাকায় কি ফিশ দিচ্ছে, প্রশ্ন করার জন্য আজকের লেখা নয়)। যাই হোক, সময়ে ট্রেন আসলো "শীয়লদহ- গেদে" লোকাল। ভয়ংকর ভিড় ঠেলে শেষ অব্দি যখন পা টুকু রেখে ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারলাম, খেয়াল করলাম কামরার একদম মাঝামাঝি জায়গাটায় আমি। পুরো ট্রেন বগিটা ভালো ভাবে যেখান থেকে দেখা যায়। আর তখনই, বৃষ্টি নামল। বর্ষার দামাল, অসময়ী বৃষ্টি।

আকাশ আস্তে আস্তে নিভে আসতে লাগল। বৃষ্টির আওয়াজের ফলে, ইয়ারফোনের আওয়াজটা কমে আসে। কানে বাজতে লাগে জুলাই-এর গর্জন। মেঘ-বৃষ্টির দস্যিপানায় গোধূলির রঙ এর মধ্যেই উবে গেছে। বর্ষা তার মেজাজী সাদা কালো রঙে রাঙিয়ে যাচ্ছে প্রশস্ত রেল পথ। এসব সাতপাঁচ যখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছি, তখনই খেয়াল হয়, একটি বাচ্চা, কাঁদছে। প্রকৃতির এই রূপ দেখে, সে ভয় পেয়েছে। স্বাভাবিক। কতই বা আর বয়শ- দেড় কিংবা দুই। তার বাবা তাকে কোলে নিয়ে অফুরন্ত আদর দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। তবে দৃশ্যটি, বেশ মন ভালো করে দেওয়ার মতো।

আর তখনই, আমার চোখ পড়ল গোটা বগি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এরকম অসংখ্য টুকরো দৃশ্য বা ফ্রেমের। আমার ঠিক উল্টো দিকে, জানালার ধারের সিটে একে অপরের কাধে মাথা রেখে, নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে এক অল্প বয়সী যুগল। ওরা বোধহয়, হয়তো প্রথমবার, "ভালোবাসা" খুঁজে পেয়েছে। আর ওদের ঠিক বা দিকে, আর একটি দম্পতি। বয়সে ওদের থেকে অনেক দশক বড়। বৃদ্ধ মানুষটি তার স্ত্রীর জন্য কোনো ভাবে বসার জায়গা করে দিলেন, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। তারপর, হাসি মুখে তারা জুড়লেন গল্প। এবং গোটা সময়টা যতক্ষণ ওনারা গল্প করে কাটালেন, আগাগোড়া একে অপরের দিকে রাখলেন তাদের চোখের মায়াবী দৃষ্টি। বুঝলাম, ওনারা "ভালোবাসা" হয়তো বহু বছর আগেই খুঁজে পেয়েছিলেন, তবে ভালোবাসেন রোজ! নতুন করে একে অপরের প্রেমে পরেন, ওনারা প্রতিদিন!

এসব ঘটনাবলি যখন নজরে পড়ছে, তখনই খেয়াল হয়, ইয়্যারফোনে একটি অতি জনপ্রিয় ইংরেজি প্রেমের গান "লাভ স্টোরি" চলছে। আর বাইরে, বাংলার বর্ষা কলকাতাকে দূরে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে মফস্বল ও গ্রামের দিকে। জীবনান্দের কবিতার একটা লাইন মাথায় আসতেই, নিজের মনে মিলিয়ে দিলাম টেলর সুইফ্ট, আর "বাংলার মুখ"।

যাইহোক, ট্র্যাক থেকে সরে যাচ্ছি দেখে, ফ্রেম খোঁজায় মন দিলাম। খেয়াল করলাম, আমার পাশে দাঁড়ানো এক কাকু, আমায় খুবই অবজ্ঞা সহ মাপছেন। বুঝতে পারলাম যে সিট ফাকা হলে তাতে বসার জন্য আমায় উনি অন্যতম বিরোধী পক্ষ ভাবছেন। আমি একটু সরে গিয়ে ওনার আশঙ্কা অমূলক প্রমান করলাম।

নজরে পড়ল সেই বাচ্চাটি এখন আর কাঁদছে না। তার বাবার সাথে সে এখন খেলায় মশগুল। গোটা ট্রেনে বাচ্চাটির হাসির আওয়াজ মেঘ কেটে বেরোনো রামধনুর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। ওদেরই পাশে বসা কলেজ ফেরত এক পড়ুয়া ক্লান্ত, অবাক চোখে এসব দেখছিল। বোধহয় ভাবছিল, কোনোদিন যদি টাইম মেশিন আবিস্কার হয়, আর এই দিনগুলোয়ে ফেরা যায়? কেমন হবে? তখন নিশ্চয় আর থাকবে না এসাইনমেন্টের ডেডলাইন, চাকরি খোঁজার চাপ, বা প্রিয় মানুষটির হাত ছেড়ে যাওয়ার ভয়! তার পাশে বসে আছে যে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করা জেঠু, ভারী জানতে ইচ্ছা করে, উনি কি ভাবছেন এই মুহূর্তে? পরের দিনের সংগ্রামের কথা? নাকি ফেলে আসা দিন, সব স্বপ্নের কথা? নাকি আসছে রবিবার কোথায় ঘুরতে যাবেন বাড়ির সবাই মিলে, সেই চিন্তা?

জানা হয় ওঠে না!

ঠিক যেমন ভাবে জানা হয়ে ওঠে না এই পৃথিবীর বেশিরভাগ অনাবিষ্কৃত গল্প, মানুষকে। আমরা চেষ্টা করে যাই, কখনো অন্যকে জানার, আবার কখনো, নিজেদের। জীবনটাও তো এই ট্রেনের মতোই, তাই নাহ্? প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো ট্রেন এসে যাচ্ছে। প্রিয় কলেজে, স্বপ্নের চাকরি, ড্রিম ভ্যাকেশন বা ভালোবাসার মানুষ- কোনো ট্রেন ধরতে পারছি, কোনোটা স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই ছেড়ে যাচ্ছে। চাইলেও ধরতে পারছি না! মাঝে মাঝে ভয় জাকিয়ে বসে, শেষ ট্রেনটাও যদি চলে যায় আর উঠতে না পারি?

যায় ও হয়তো। রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক তখন স্বান্তনা দিতে আসে। পারে না। ডাকগুলো বুকের আর্তনাদ হয়ে ঘুরে বেরায়। তবু, সব শেষে, ভোর হয়। অন্ধত্ব কাটিয়ে, ফের নতুন ট্রেন আসে। তোমার জন্য। আমার জন্য।

মেঘলা দিনে বৃষ্টির পরেও যারা রামধনু দেখতে পায়না, সেই সকল যাত্রীর জন্য!

No comments:

Post a Comment

I Owe You A December

For those, Who still silently cries alone in the bed, when all the switches go off– May you find your light soon, and for foreve...