বসন্ত, আমি, এবং ছুটির দুপুর :
দোলযাত্রা বাদ দিয়ে বসন্তের সাথে আমার তেমন কোনো আলাপ পরিচয় নেই। নিজের দোষে বলব না... মফস্বলের যে প্রান্তে থাকি, তা শহরের চেয়ে কম কিছু নয়। পলাশ বা কদম ফুলের গাছ দেখার সৌভাগ্য কাজেই আমার ছোটবেলা থেকে তেমন হয়নি। এক-দুটো কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়া গাছ দেখেছি যদিও। তবে অদ্ভুত ভাবে, সেই গাছগুলোয় শীতকাল ছাড়া সারা বছরই প্রায় ফুল ফুটে থাকত। জানিনা কি ভাবে।
আমার শীতের কুয়াশা আর বৃষ্টি ভালো লাগে। বসন্তে আবিরের ছোঁয়ার মাহাত্ম্য অনুমান করতে পারলেও, গভীর নির্জন রাতের কুয়াশার জাপ্টে জড়িয়ে ধরা, বা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মনের গভীরকে শান্ত করা- এসব আমাকে বেশি টানে।
সেই আমার বসন্তকে ভালো লাগল। না, তার বাহ্যিক রূপ দেখে নয়। ছুটির দুপুরে যখন একের পর এক ভাবনা, চিন্তা, দুশ্চিন্তা, মনের মাঝে জটিল আঁকিবুঁকি কাটছে, ব্যর্থ অতীত আর অজানা ভবিষ্যতের চিত্রনাট্য যখন প্রায় দমবন্ধকর অবস্থা থেকে শ্বাসকষ্টের চেহারা নিতে যাবে; ঠিক তখনই... কোনো এক কোকিল এর ডাক, বেশ কানে বাজল। "কুহুউউ, কুহুউউ" করে সে এক মনে ডেকেই চলেছে, আশেপাশের কাউকে কোনো পাত্তা না দিয়ে। মনে হলো যেন বলতে চাইছে, "বসন্ত এসে গেছে। সামনে তাকাও...গাছে নতুন পাতা এসেছে। শীত যত রুক্ষই হোক না কেন, তাকে আমার কাছে শেষ অব্দি হারতেই হবে।"
সেদিন থেকে বসন্ত কে আমার ভালো লাগে। শ্বাসকষ্ট যে একদম হয় না, বলব না; তবে বসন্তের কৃপাতেই ইনহেলারটা নিতে শিখে গেছি।
শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়, ছুটির দুপুর গুলোয় কোকিলের ডাক শুনতে শুনতে বসন্তের এই গল্পগুলো শোনানোর জন্য যদি কেউ একজন থাকত... মন্দ হতো নাহঃ।
ঝরা পাতার স্তুপে কি পলাশ পাওয়া যায় ?
সেই কোন বসন্ত থেকে কবিরা ঝরে যাওয়া পাতা কে জীবনের সাথে তুলনা করে চলেছেন। উইলিয়াম শেক্সপিয়র থেকে অডেন হোক কিংবা মার্গারেট কোলে; বা হালের স্যোশ্যাল মিডিয়ার তরুণ কবিগণ, ঝরা পাতাকে বার্ধক্য এবং জীবনের গোধূলি বেলার সাথে তুলনা যুগে যুগে হয়ে আসছে।
তাই মনে প্রশ্ন জাগে- ঝরা পাতার মাঝেও তো ফুল পাওয়া যেতে পারে। শিমুল ফুল নাহয় নাই পেলাম, একখান পলাশ? তাও কি খুঁজে পাওয়া যেতে পারে না?
প্রশ্নখানি অহেতুক করিনি। যেই ছেলেটা এই সেদিন বাবা-ঠাকুমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল, আজ সে বাড়ির থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরের কলেজে পড়ে। যেই মেয়েটা ছোট থেকে প্রায়শই অসুস্থ হয়ে পড়ত, যার মাকে প্রায়ই বিছানার ধারে বসে রাতগুলো জেগে কাটাতে হতো... আজ সেই মেয়েটিই মায়ের শরীর খারাপ হলে, সব দায়িত্ব নিপুণ ভাবে পালন করে। হ্যাঁ, রাতও জাগে।
এদেরকে কি "ঝরা পাতা" বলা যায় না? এরাও তো বেশ কয়েকটা বসন্ত পার করেই এল।
আর একটু বাইরে বেরলে আরও দেখবেন... আপনার পাড়াতেই যেই ছোটদের দল বল খেলত, তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ যে ছিল- খারাপ চেহারা, খেলতে পারত না, শুধু বল কুড়িয়ে আনত... সেই ছেলেটা আজ ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে মফস্বল থেকে ময়দান, ক্রিকেটার হবে বলে! যেই মেয়েটার সকাল হতেই গানের রেয়াজ শুনে পাশের বাড়ির কাকু-কাকিমারা কথা শোনাতেন, "বেসুরো" বলে টিটকারি মারতেন, সে কিন্তু ইতিমধ্যেই দুটো ছবিতে প্লেব্যাক করে নিয়েছে।
আর ঠিক এই কারণেই নিজে কবিতা লিখলেও, আমার কবিদের ভালো লাগে না। ওরা শুধু খারাপটা লেখে।
যায় ! যায় ! মানুষ চাইলে কি না খুঁজে পেতে পারে... আর এতো স্রেফ ঝরা পাতার স্তুপে একটা পলাশ ফুল। একটা নয়, খুঁজলে আসলে অনেকগুলোই পাওয়া যায় !
বসন্তের গান- সে কি সত্যিই সুরেলা ?
ধরুন এক শান্ত বিকেলে আপনি নিশ্চিন্ত মনে ছাদের বাগানে হাটছেন, একমনে আকাশে আলো আঁধারির খেলা দেখছেন। হঠাৎ আপনার এক প্রিয় বন্ধুর ফোন আসল। সে দিব্যি সুস্থ আছে, আপনার সাথে খোসগল্প করল প্রায় একঘণ্টা... আর ফোনটা রাখার ঠিক আগে একই রকম ভাবলেশহীন ভাবে বললো যে ডাক্তার তাকে ফাইনাল আল্টিমেটাম দিয়ে দিয়েছে। দানব রোগটাই শেষ ওব্দি জিতবে। আর ক'টা দিন। ক'টা মাস। খুব বেশি মিরাকল্ হলে, ক'টা বছর।
ময়ূরাক্ষী সিনেমায় সৌমিত্র চ্যাটার্জির একটা ডায়লগ ছিল, "মাঝে মাঝে জীবনের কিছু মুহুর্তে মনে হয়, You need background music, সিনেমার মতো।" বসন্ত আমার কাছে সেই চলমান ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। কখনও একেবারে থামে না। ভালো, মন্দ দুইয়ের মিশেলে, মুহুর্তদের সাথে সে সর্বদা থেকে যায়!
যেমন সেই মুহুর্তটাতেই ধরুন, আপনার খুব করে ইচ্ছে করবে, ফোনে বলা সব কথাগুলোকে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে "মিথ্যা" আখ্যা দিতে। ইচ্ছে করবে, বাইরের সব কঠিন খোলস ছেড়ে, হাউ হাউ করে একটু কাঁদতে।
আর দেখবেন, বসন্ত তখনই আবার আপনার সঙ্গে প্রতারণা করবে। দুর দুরান্ত থেকে ভেসে আসবে চেনা সেই কোকিলটার ডাক। বহুদিনের অপেক্ষায় থাকা চাকরিটার অফার লেটার কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আপনার মেলবক্সে ল্যান্ড করবে। হয়তো বেলা বোস কে কিছু বলার আগেই আপনার হোয়াটস্যাপে মেসেজ আসবে, "বাবার আনা সম্বন্ধটাকে না বলে দিয়েছি। তোমার সাথেই আজীবন কাটাব।"
কি বলবেন শেষ বিকেলের সেই সূর্যাস্তকে? বসন্তের রূপে ছদ্মবেশী ওই "জীবন" নামক শব্দটাকে?
"ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা বড্ড জোরে হয়ে যাচ্ছে। একটু চেঞ্জ করা যায় না?"
রইল বাকি যা...
সব কথা বোধহয় আমাদের না জানলেই ভালো। যেমন সেই বন্ধুটির ফোন কলের শেষ লাইনটা। বা সেই ক্রিকেটার ছেলেটির গভীর রাতে স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার আশঙ্কায় ঘুম না আসা। সেই মেয়েটির সাথে ইন্ডাস্ট্রিতে ঘটে চলা নোংরা পলিটিক্স। বা কিছু কঠিন সত্যি, যা আমাদের সকলের জীবনে কোনো না কোনো ভাবে অন্তর্জালের মতো মায়াবী ভাবে জড়িয়ে গেছে। যাদের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু আমরা স্বীকার করি না।
তবু, এসবের মাঝেও মনে হয়, বসন্তে তুমি আসলে ভালো হতো। ভালো-খারাপ সহ "সব পেয়েছি"-র ঋতুটা, আর আমি; দুজনেই আসলে আসল পূর্ণতা পেতাম, তুমি থাকলে।
তাই বলছি ওই জটিল, কঠিন ধাঁধার মতো প্রশ্নগুলো থাকা সত্বেও, তুমি এসো। একসাথেই না হয় উত্তরগুলো খোঁজা যাবে। হয়তো এর থেকেও বেশি কঠিন প্রশ্নের ভাড়ার অপেক্ষায় থাকবে। থাক। সে সবেরও সমাধান করে ফেলব হাতে লেখা সহজ কবিতার মতো... একবার চুলের খোঁপায় কৃষ্ণচূড়ার সমাহার ঘটিয়ে তুমি যদি পাশে এসে দাঁড়াও!
একসাথে দেখতে যেতাম দুজনে পলাশের বন। কুড়িয়ে নিতাম সেখানে অযত্নে পরে থাকা সব পুরোনো গোলাপের পাপড়ি। "না বোঝা" আবিরের ছোঁয়ার মাহাত্ম্য প্রথমবার উপলব্ধি করে, নিজের হাতে বসন্তের সন্ধ্যা নামাতাম, তোমার নাম করে।
সেই 'নেভার এন্ডিং' ব্যাকগ্রাউন্ড মিয়জিকটাও, দুজনে ইচ্ছামতো চেঞ্জ করে নিতে পারতাম, কিন্তু !
আসবে, বসন্তে.....?
No comments:
Post a Comment