কেন এই ভাবনা? ধুর্! বোঝেন না যেন কিছু!
প্ল্যাটফর্মে সিঁড়ির মুখে সিমরণকে দেখতে পেল রাজ। ঘড়িতে সময় দেখছিল সে।
"নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে এরকম কাকতালীয় ঘটনা ঘটলে, সেটাকে কি আর accidental meet বলা যায়? সুপ্রভাত"
"সাড়ে এগারোটায় সুপ্রভাত? ভালো কথা। তবে, planned accident কথাটা শুনেছেন কখনো?"
"তার মানে, আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, কি?"
কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসলো সিমরণ। "মেট্রো এসে গেছে কিন্তু"
"আচ্ছা, মেয়েরা সোজা উত্তর দেয় না কেন বলুন তো?"
মেট্রোয় দরজার দুপাশে হেলান দিয়ে দুজনে দাঁড়িয়ে আছে। আজ বেশ ভিড় আছে।
"এতো জানেন মেয়েদের ব্যাপারে, দারুণ ব্যাপার তোঃ। অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ একেবারে মনে হচ্ছে।", শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে কথাগুলো রাজের দিকে ছুড়ে দেয় সিমরণ।
"সব কিছু জানতে অভিজ্ঞতা লাগে না। কিছু জিনিস সাধারণ জ্ঞান হিসেবে ধরা হয়। আর অসাধারণ কারোর সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য হলে, ওই সাধারণ জ্ঞানটুকুই অনেকটা কাজ করে দেয়"
"তা আপনার এই সাধারণ জ্ঞান দিয়ে আমাদের সেই না মেলা অঙ্কটার হিসেব মিললো? নাকি তা শুধু ফ্লার্ট করতেই জানে?"
"সুস্থ ফ্লার্ট করাটাও অঙ্কই ম্যাডাম। জীবনের বৃহত্তম সিলেবাসে, ওটা খুব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্ক!"
"আমার ব্যাপারে কিছুই জানেন না- আচ্ছা, এক মিনিট। আমরা কি তুমি করে কথা বলতে পারি? সমবয়সী কারোর সাথে আপনি করে বলাটা-"
"হ্যাঁ, এমনিতেও বিয়ের পরে-"
"কি?!" রাজ উত্তর দেওয়ার অবাক চোখে প্রশ্ন করে সিমরণ।
"না মানে, হ্যাঁ। আনন্দের সাথে।"
"তো যেটা বলছিলাম, অচেনা একজনের সাথে এরকম কথা বলতে, বা ফ্লার্ট করতে, কোনো রকম অনিশ্চয়তা জাগে না?"
"নাম, কলেজ, ব্রাঞ্চ কত কিছুই তো জানি। আসলে অঙ্ক মেলানোর জন্য ইনফর্মেশন তেমন জরুরি নয়। ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যাবসায় লাগে। তুমি বলো আমায় ভরসা করে কথা বললে কি ভাবে? Social Media তে স্টক করে নিশ্চয়?"
"বাদ দাও। পার্ক স্ট্রিট চলে এসেছে। পরের স্টপেজে নামতে হবে। Do you believe in destiny? কি মনে হয়, পরের সপ্তাহে আবার planned accident হবে?"
"চাইলে বাঙালি নোবেল জিতে নেয়, আর এ তো মেট্রো। আলবাত হবে। কন্ট্যাক্ট করতে পারলে-"
"তাহলে তো আর accident থাকে না বিষয়টা"
"বেশ। চ্যালেঞ্জ রইল। বারে বারে এই accident-টাই ঘটাব না হয়।"
"বেশ! অপেক্ষায় থাকব সপ্তাহখানেক। আর destiny-র উত্তরটাও সেদিনই নাহয় শুনব, accident ঘটলে। তবে, মঙ্গলবারই কিন্তু শেষ দেখা আমাদের সম্ভবত। তারপর মহালয়া, পুজোর ছুটি। আর ছুটি শেষে পরীক্ষা। চান্স নেই দেখা হওয়ার আর।"
"Accident ঘটবেই। অঙ্ক পুরো মেলা অব্দি তো ঘটতেই হবে! আর শেষ বল খেলার আগে জানবেন, কোনোদিন ম্যাচ শেষ হয় না, ম্যাডাম।"
সিমরণ চলে যেতেই মেট্রোটা আবার সেই মতো অফিস-টাইমের গোমরা মুখো কাকুর মতো চলতে লাগল। আর অঙ্কের ছাত্র রাজ, ইংরাজি শব্দ "destiny" নিয়ে গবেষণায় মন দিল।
আর শহরে, এ বছর আগে আসা শরৎ মুচকি হেসে আবার মনে করাল, পুজো কিন্তু এসে গেছে। হাতে সময় খুব কম, খুব!
৭
একদম। নির্ভুল অনুমান আপনার পাঠক। আজও মঙ্গলবার এবং... এবং গল্প এগোনোর দিন। পুজোর আগে, মেট্রোর ভিড় কিন্তু ক্রমশ বাড়ছে। আর রাজের রুমাল বলে দিচ্ছে, টেনশনে সে ঘেমে অস্থির। নায়িকা, আসবে তো? সময় তো হয়ে গেছে।
হঠাৎই রাজের কাঁধে আলতো টোকা পড়লো। "শরৎকালে বৃষ্টি হচ্ছে, আর তুমি এমন ঘামছো কেন?"
"সেটা বুঝলে তো কবেই গল্প শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রীদের যে মাথায় শেক্সপিয়র বাদে আজকাল কিছু ঢোকে না, সেটা আমার জানা ছিল না", সিমরণকে দেখে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে উত্তর দেয় রাজ।
"উফফ্ রেডিও জকি হতে পারতে। এতো স্পনটেনিয়াস!"
"বললে সেটাও হয়ে যাব।" হাসতে থাকে রাজ।
"ঠিক আছে। আপাতত, মেট্রো এসে গেছে। চলো। আজই তো শেষ সফর।"
"আগেরদিন ডেস্টিনি-র কথা বলছিলে না? একটু ঘেঁটে বুঝলাম, প্রাচীন গ্রিক মাইথোলজির কনসেপ্ট এটা, যার মানে, এমন কিছু ঘটনা ঘটা, যার উপর আমাদের কোনো হাত থাকে না। আমার কাছে এই মেট্রো সফরটাও কিন্তু একটা ডেস্টিনিরই অঙ্ক। শুরুটা হিসেব মেনে হয়নি যখন, শেষটারও দায়িত্ব মন বলছে, ডেস্টিনিই নেবে।"
"ডেস্টিনি জানি না, তবে কাল মহালয়া। পুজো এসে গেল।"
"হুমম্। তা ভোরবেলায় ওঠা হয়, নাকি ঘুমিয়েই দিন কাবার?"
"এক্সকিউজ্ মি! প্রতি বছর এই রাতটা আগাগোড়া জেগে থাকি। আর কাল তো কলেজে 'আগমনী উৎসব' আছে দশটা থেকে। আমার একটা সোলো ডান্স পারফোরম্যান্সও আছে সেখানে..."
এক নাগাড়ে কথা বলে যেতে থাকে সিমরণ। রাজ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে প্রতিটা শব্দ। কি আছে সেসব বাক্যে? কি এমন জাদুবলে রাজ নিজেকে আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলছে... সমর্পণ করছে এক অনিশ্চিত অজানার কাছে?
আর সিমরণই বা কেন এতো কথা বলছে রাজকে? বলতে বলতে সে নিজেই অবাক হয়ে যায়। আগামীকালের অনুষ্ঠানের কথা, তার জন্য নেওয়া একমাসের প্রস্তুতি, নতুন শাড়ি, তার মায়ের দেওয়া একটি আংটি কালকের জন্য– যা আজ শেষ প্র্যাকটিসের জন্য সে পরে এসেছে, তবে এখনো বেশ লুজ্ হচ্ছে আঙ্গুলে– এই সমস্ত কথা সে বলেছে রাজ কে। সে তো কোনোকালেই এতো এক্সট্রোভার্টেড ছিল না.... এখন কেন সে আপনিই হয়ে যাচ্ছে, তাহলে?
কিন্তু সময় কারোর জন্যই থেমে থাকে না। বিশেষ করে, তা যদি হয় অনুভূতিদের নিয়ে দোলাচল ও দ্বিধাগ্রস্ত মনেদের দন্দ্ব, সে ক্ষেত্রে 'সময়' নামক সেই অশরীরী আরো কঠিন। তার কাঠিন্যতা কে মান্যতা দিয়েই, কথার মাঝে হারিয়ে গিয়ে আমাদের গল্পের চরিত্রেরা চলে এসেছে ময়দান মেট্রো স্টেশনে। যেখানে, তাদের জন্য কি আবার অপেক্ষায় রয়েছে সেই চেনা 'অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স"?
"এবার যেতে হবে তাহলে রাজ। অঙ্কটায় বোধহয় কোথাও হিসেবে ভুল হয়ে গেছিল, তাই আর মেলানো গেল না।"
"আমার অঙ্কে ভুল হয় না, সিমরণ। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক দুইয়েতেই একশো, প্রথম সিমিস্টারেও ইউনিভার্সিটি টপার। আজ হোক বা কাল, LHS=RHS , প্রুভ করবোই!"
রাজের কথা, বলা ভালো 'প্রতিজ্ঞার' সাক্ষী হয়ে থাকা মেট্রোর দরজাটা বন্ধ হতেই, মিলিয়ে গেল সিমরণ।
বরাবরের মতো হাসিটি তার মুখে আজও ছিল বটে, তবে মুখের গোপন বিষণ্নতার রেখাগুলোকেও আড়াল কিন্তু করা গেল না, আর!
৮
ভিড় মেট্রোতে দমবন্ধ হয়ে আসছে রাজের। তবে তা মানুষদের জন্য নয়, এক মানবীর চিন্তায়। অনুভূতিদের গোছাতে এতো সময় লাগে, যে সঠিক সময়টাই পেরিয়ে যায়। এ শুধু রাজের না, আমাদের সকলের সমস্যা। ওই যে শেক্সপিয়র লিখেছিলেন না, "To Be, Or Not To Be"– এই অনিয়তীর খেলাই হলো আসলে, "জীবন।" কঠিন গেম বড্ড। কিন্তু, খেলা ছাড়লে চলবে না। আর এটাই পৃথিবীর একমাত্র খেলা, যেখানে আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, চাইলেও হারতে পারবেন না। আজ হোক বা কাল আপনিই জিতবেন! শুধু, পিচে টিকে থাকতে হবে...
কিন্তু এই মুহূর্তে রাজের কপালে এক শহর মেঘ সমান দুশ্চিন্তার ভ্রুকুটি। তবে কি, সবটাই শেষ? সিমরণের সাথে তার আর দেখা হবে না? এবং এই, "আর কোনোদিন দেখা হবে না" কথাটা মাথায় আসলেই তার বুকে দুরুদুরু ব্যথা হচ্ছে, হাত পা ঠান্ডা লাগছে– এসব শুধুই মেট্রোর এসি-র জন্য? তাই মানতে চায় রাজ, কিন্তু পারে না।
এই আমাদের দোষ। কিছুতেই মানতে পারি না, আমরাও প্রেমে পরতে পারি! একবার ব্যর্থ হলেও, ভালোবাসা আবার– যতদিন না সঠিক মানুষটাকে আমরা পাই, ইতিহাসের মতো বারে বারে ফিরে আসে। এবার সেই ফিরে আসাটাকে যদি আপনি হেলায় হারিয়ে ফেলেন কেবল অনিশ্চয়তা এবং ভয়ের জন্য, তাহলে ভাই, খুব চাপ!
রাজ এখন ক্রমশ নিশ্চিত হচ্ছে তার অনুভূতিদের ব্যাপারে। কিন্তু... বড্ড দেরি হয়ে গেল কি? উপায় কি আছে আর? সিমরণের ফোন নম্বর বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টও তো রাজের কাছে নেই। মানে সে খুঁজেছিল অবশ্যই, কিন্তু পায়নি। তাহলে...?
আর যখন রাজ হাল ছেড়ে দেওয়ার পথে, ঠিক তখনই আচমকা একটা ব্রেক কষল কলকাতার হার্টথ্রব– মেট্রো। হঠাৎ ঝাঁকুনিতে কম্পার্টমেন্টের বাকি সকলের মতো বেসামাল হয়ে যায় রাজও। আর সেই মুহূর্তে, তার জুতোর সাথে সংস্পর্শ হয় ধাতব কিছু বস্তুর। জিনিসটা দেখে, রাজের চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না। আর চকিতে তার মনের সব অন্ধকার দূর হয়ে গেল।
জিনিসটা হলো, সিমরণের হাতের সেই আংটিটা
কি বুঝছেন তাহলে পাঠক ভাই/ বোন/ দাদা/ দিদি? শরতের শহরে, দেবীপক্ষের আগে এরকম একটু-আধটু ম্যাজিক হয় থাকে। উপভোগ করুন। হয়তো পরের গল্পটা আপনার জন্য তোলা রয়েছে।
৯
১০টা থেকে প্রোগ্রাম শুরু হলে নিশ্চয় সাড়ে ন'টার মধ্যে সিমরণকে কলেজে পৌঁছাতে হবে। এই হিসাব কষে পৌনে ন'টার মধ্যে দমদম স্টেশনে এসে গেছিল রাজ। আর তারপর থেকে, শুধুই অপেক্ষার প্রহর। কখন আসবে সিমরণ? ঘড়িতে সময় তো ছুটে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে ন'টা বাজে। এখনও সিমরণ কে দেখতে পেল না, রাজ। তাহলে?
দেবীপক্ষের সূচনার দিনে, 'উমা' এতো কঠোর হবে তার ছেলে মেয়েদের উপরে?
রাজ ঘামতে থাকে। গতকালের অনিশ্চয়তা বিদায় নিয়েছিল অনেক আগে। কিন্তু সময়ঘড়ি কাঁটা যেরকম উসেইন বোল্ট হয়ে এগোচ্ছে, তাতে অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্সের ভয় ফের জাঁকিয়ে বসছে তার মনে।
ধুরর্! কি যে ছাতার লিখি... শুরু থেকে শেষ অব্দি শুধু 'অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স'-এর সমাহার। এটা গল্প নাকি নিজের জীবনকথা?
নাঃ! আর বেশি ভেবে লাভ নেই। জীবনে প্রথমবারের জন্য অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্সের বিরুদ্ধে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে রাজ। যা হবে দেখা যাবে। ময়দান মেট্রো স্টেশন থেকে সিমরণের কলেজটা কাছেই। একবার একটা কুইজ কম্পিটিশনে সে গেছিল ওখানে। আর সময় নষ্ট না করে, রাজ মেট্রোতে উঠে পড়লো। আজ কিন্তু, মেট্রোটা একদম ফাঁকা!
পাঠক বন্ধু/ বান্ধবী, আর হ্যাজবো না। এবার হয় এসপার, নয় ওসপার। আমি যদিও এখনো জানি না জানেন, শেষটা কেমন হবে। মানে এতো জট পাকিয়ে রেখেছি, খোলাটা এখন চাপের লাগছে আর কি– বুঝতে পারছি না কি করে ছাড়াব ... দেখা যাক, কি দাঁড়ায়!
ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপিরিয়েন্স না নিয়ে অন্যদের নিয়ে প্রেমের গপ্পো লেখা হেবি ঝামেলার মশাই, হেব্বি ঝামেলা।
১০
সিমরণের কলেজের সামনে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে রাজ। পাশে দুটি বড় শিউলি গাছের ঝরে পরা ফুল ছড়িয়ে আছে সারা রাস্তা জুড়ে। পারিজাতের স্নিগ্ধ গন্ধে মাতোয়ারা গোটা এলাকা। কিছু বাড়ি থেকে ভেসে আসছে টিভিতে হওয়া কার্টুন মহালয়ার আওয়াজ। এক ঝলক রাজের নিজের ছোটবেলা মনে পড়ে গেল। কিন্তু না। এখন মনকে ডাইভার্ট হতে দিতে গেলে চলবে না। কিন্তু... এখন সে করবে কি? সিমরণের পুরো নাম, সেমেস্টার, ও ডিপার্টমেন্ট জানা আছে তার। কাজেই, কাউকে দিয়ে খবর পাঠাতে হবে। এছাড়া উপায় নেই।
কলেজের গেটের মুখে একটা ছোটো গ্রুপ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কাছেই গেল রাজ। সিমরণের ডিটেলস দিল তাদের, এবং অনুরোধ করল রাজের সাথে তার একবার ওখানে দেখা করানোর জন্য।
"সে তো বুঝলাম, কিন্তু তোমার নামটা কি বলব হে ভাই?" ওদের মধ্যে থেকে একজন রাজের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে।
দু সেকন্ড ভেবে রাজ উত্তর দেয়, "নাম বলার দরকার নেই। শুধু বলবেন যে, উনি আমায় খুব ভালো চেনেন। এবং আসাটা দুজনের জন্যই ভিষণ প্রয়োজন।"
"এতো বলিউড ফিল্ম লাগছে রে। যা, যা, সিমরণ কে তার রাজের কাছে এনে দে", ওদের মধ্যে থেকে আরেকজন বলে ওঠে। কথাটা শুনে সবাই হাসতে লাগে। মুচকি হাসি, ঠোঁটে ধরা পড়ে রাজেরও। বলিউড সিনেমাই তো বটে। জীবন মানেই তো আসলে আস্ত একটা সিনেমা...
মিনিটখানেক পরেই সিমরণকে দেখতে পেল। লাল শাড়ি, ছাতিম দিয়ে বাঁধা চুলের খোপা ও কাজল চোখে, আজ তাকে অপরূপা সুন্দরী লাগছে। চোখ ফেরাতে পারে না রাজ।
"হাই। সুপ্রভাত।"
"হাই! অপূর্ব সুন্দর লাগছে আজ তোমায়।"
"উফ্! এসেই শুরু। যদিও এখন আমারও তাই মনে হচ্ছে অল্প বিস্তর, যেভাবে আমার আসা ইস্তক তোমার চোখের পাতা পড়ছে না... যাক, তুমি আসলে তাহলে, শেষ পর্যন্ত?" স্বভাবসুলভ হাসি হেসে কথা শুরু করল সিমরণই।
"মানে হ্যাঁ। আসতেই হতো আজ। তোমার অনুষ্ঠান হয়ে গেছে, কি?"
"হ্যাঁ। এইমাত্র শেষ হলো।"
"ইশ্! আমি তোমার আংটিটা এনেছিলাম যেটা তুমি মেট্রোয় ফেলে এসেছিলে। দেরী হয়ে গেল-"
"ওওহঃ! বাগদান কমপ্লিট গাইজ্।" রাজ আংটিটা বের করতেই পাশের সেই গ্রুপটি মজা নিতে লাগল।
"এই! তোরা থামবি? রাজ, ওই শিউলিতলাটার দিকে চলো তো।"
শিউলিতলায় গিয়ে আংটিটা সিমরণকে ফেরত দেয় রাজ।
"আর রাজ, কোনো দেরি হয়নি। তুমি আসবে, আমি ভাবিনি।"
"বুঝলাম না, কিন্তু উহম্... ইয়ে- মানে আর একটা কথা ছিল।"
"কি?"
"হিসাবটা মিলে গেছে"
"হ্যাঁ?"
"হ্যাঁ! বুঝে গেছি যে আবার একটা কাণ্ড করে ফেলেছি জীবনে।"
"কি?"
"কি করে যে বলি... হুর্ বলেই দিই। কি আর হবে?প্রেমে পড়েছি। তোমার।"
"উহু! হয়নি। এটা একটা স্টেপ হলো। Confession. এতে আমার কিছু বলার বা করার থাকে না।"
"সেরেছে- না! সারেনি।" বলেই রাজ পাশের শিউলি গাছ থেকে একটা ফুল তুলে হাতে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সিমরণের সামনে।
"সিমরণ, 'পলট্। পলট্। পলট্' ওটা চাইলেই বলতে পারতাম, তবে ওটা অলরেডি অন্য একজন রাজ, অন্য একজন সিমরণকে বলে ফেলেছে। কিন্তু বাঙালি তো, তাই 'ভালোবাসি'টা একটু অন্যরকম ভাবে বলতে চাই-
পুজোতে বেরোবে আমার সাথে?"
"শুধু এই পুজোয়?"
"না। না। ছিঃ! ছিঃ!
DDLJ তো চিরকালীন। 'প্রতিটা' পুজোতে বেরোবে আমার সাথে?"
"হ্যাঁ। তবে অষ্টমীর দিন পাঞ্জাবী পরতে হবে, তাহলেই!"
"পুরো পুজো পাঞ্জাবীই পরবো শুধু।"
"থাক। কিন্তু এবার আমার একটা confession আছে।"
"কি?"
"এই আংটি ফেলে আসার প্ল্যানটা আমারই ছিল। তুমি কিছুই বলতে পারছ না দেখে আমি ভাবি একটা শেষ চেষ্টা করে দেখি। তাই কায়দা করে আংটিটা তোমার জুতোর কাছে ফেলে দিই। And, কুড়ি টাকার আংটি, জীবনে অনেক বড় কিছু করে দিল!"
হাসতে হাসতে রাজ আরেকটি শিউলি তুলে সিমরণের খোপায়ে আটকে দেয়। একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে তারা পলকহীন ভাবে, যেই দৃষ্টি বলে দেয়, মুখে ভালোবাসি না বলেও ভালোবাসা যায়- গোটা শহরকে সাক্ষী রেখে, শারদীয়া শরৎকে সাক্ষী রেখে!
বুঝলেন পাঠক, Calculation এ মাঝে মাঝে গণ্ডগোল হওয়াটা দরকার– একটা মাত্র জীবন, সেটাও যদি হিসাব ধরে চলে, তাহলে ভাই খুব চাপ... অঙ্কের খাতা হয়ে কি সারাটা জীবন বাঁচা যায়?
কাজেই, হিসাব ভুল হোক কোনো কোনো দিন। যেদিন খাতা বন্ধ করবেন, দেখবেন শেষ অঙ্কটা কোনো ভাবে ম্যাজিকের মতো মিলে গেছে– ঠিক রাজ-সিমরণের মতো ! আর, এই ম্যজিকের নাম তো 'ভালোবাসা'–গোটা জগতসভার শ্রেষ্ঠতম শক্তি, ও সর্বোচ্চতম অনুভূতি।
(ফেলে আসা শিউলিতলার স্মৃতিমাখা গন্ধ, ও ভালোবাসার অনুভূতি বাদে এই গল্পের সব কিছুই কাল্পনিক)
No comments:
Post a Comment