Sunday, 24 December 2023

এক মুঠো কুয়াশা

                                   ১


অয়ন বেশ করে জাঁকিয়ে বসল নিজের জায়গাতে। নাহঃ ট্রেন লেট তেমন করেনি। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এক ঘন্টা লেট করাটাকে অন্তত লেট বলা চলে না। মাইকে হওয়া ঘোষণা অনুযায়ী আরও চল্লিশ মিনিট পর ট্রেন গোয়ালিয়র স্টেশন ছাড়বে।

প্রায় ৮ মাস পর এবার ঘরে ফেরার পালা। গোয়ালিয়র মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া অয়ন। নিজের শহর কলকাতায় বড়দিনের ছুটিতে সে ফিরছে। নিজের বাড়ি, পরিবার, শহর ছেড়ে এতগুলো মাস বাইরে থাকার কষ্ট যে কি তা যে থেকেছে সেই শুধু জানে। 

অয়ন যে কম্পার্টমেন্টে আছে, সেটি প্রায় পুরোই ফাকা। তবে ভর্তি হয়ে যাওয়ার সময় এখনও আছে। কারণ আরও কিছুক্ষণ অন্তত ট্রেন দাড়াবে এখানে। ঘড়িতে সময় এখন সকাল ৭টা। বাড়িতে ফোন করে ট্রেনে উঠে পড়ার খবর দিল অয়ন। ট্রেন ছাড়ল আরও প্রায় কুড়ি মিনিট পর।

আসলে জীবনে সব কিছু যদি ঘড়ি ধরে, সময় মেপে চলে, তাহলে ভিষন সমস্যা....


                                  ২


ঘড়ির কাটা যখন সাড়ে নটা ছুঁই ছুঁই, ট্রেন থামল দাতিয়া স্টেশনে। এক কাপ চায়ের খুব প্রয়োজন বোধ হতে লাগল অয়নের। ট্রেনের দাড়ানোর সীমিত সময়ের মধ্যেই সে প্ল্যাটফর্মে নামল চায়ের খোঁজে। সন্ধান পেতেই সে হাতে চা ভর্তি ভাড় নিয়ে দৌড় লাগাল। না। ট্রেন ছাড়েনি।
অয়ন নিজের সিটে এসে দেখল, তার উল্টোদিকের আসনে নতুন একজন প্যাসেঞ্জার এসে বসেছেন।

একটি মেয়ে। খুব সম্ভবত অয়নেরই বয়সী।
মুখটি অসম্ভব গম্ভীর, এবং শান্তও। চোখদুটোয় কিরম একটা মায়া জড়ানো। চশমার আড়ালেও স্পষ্ট চোখের খয়েরি মণিদুটো মনে হচ্ছে যেন চমকাচ্ছে।

চমকাচ্ছে কি? চোখ কি শুধুই আনন্দ পেলে এইসব ঝিলিক মারে? চোখের জলে বছরশেষের রোদ এসে পড়লে কি এইসব ঝিলিকেরা দেখা দেয়না?

তবে এতসব অয়ন একেবারেই খেয়াল করেনি।
সে চুপচাপ তার জায়গায় বসে চায়ের ভাড়ের প্রতি মনঃসংযোগ করল।


                                   ৩


রোদের কথা বলে তো দিলাম, তবে বাইরের আবহাওয়ায় তার চিহ্ন নেই বললেই চলে। ঘন কুয়াশায় চারিদিক ঢেকে আছে। 

অয়ন লক্ষ্য করল, সামনের মেয়েটি একটি বই বের করে পড়ছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রক্তকরবী'। বইটা পড়া ওর। অনেকদিন পর কোনো বাঙালি দেখল অয়ন। গোয়ালিয়রে ওর কলেজে কোন বাঙালি নেই। যেটুকু সময় বাংলায় কথা বলে ওই বাড়ির লোকেদের সাথে মোবাইলে। আর মাঝেমধ্যে যখন স্কুলের বন্ধুদের সাথে কথা হয়, তখন।

একবার ভাবল যে কথা শুরু করবে কিনা। কিন্তু অপর মানুষটি কি ভাবে বিষয়টি নেবেন এই ভেবে সে আর এগোলো না। তার ওপর মেয়েটিকে দেখে যা গম্ভীর বলে মনে হচ্ছে...

কথা বলার ইচ্ছেটা একেবারে গেলনা অয়নের। তাই সকালে বাংলা খবরের কাগজ মোবাইলে পড়া হয়ে গেলেও, একজন কাগজ বিক্রেতাকে আসতে দেখে জিগ্যেস করল বাংলা কাগজ আছে কিনা। উত্তরটা অয়নের জানাই ছিল। নেই।

যে জিনিসটায় অয়ন নিশ্চিত ছিল না, সেটা হল এই বাক্যবিনিময়ের প্রতিক্রিয়া।

সুফল মিলেছিল। কাগজ বিক্রেতা ভদ্রলোকটি চলে যাওয়ার পরে প্রতিক্রিয়া হিসেবে অয়নের অপর প্রান্তে বসা আমাদের গল্পের নায়িকার মুখে কুয়াশা কেটে অল্প রৌদ্রের ঝিলিক অয়নের চোখে ধরা পড়েছিল।

প্রচন্ড কুয়াশা মাখা সকালটায়ে মায়ের গলা বাদ দিয়ে প্রথম কোনো আওয়াজ অয়নের ভাল লেগেছিল.... অনেকদিন পর।


                                    ৪


-আপনিও বাঙালি?

প্রথম কথা মেয়েটিই বলতে শুরু করল।

- একদম। আগে খাঁটি ছিলাম। এখন প্রবাসী।
- ভালো বললেন। আমিও তাই-ই। এক্স খাঁটি। আশা করছি হাওড়া ওব্দিই গন্তব্য?

গম্ভীর প্রকৃতির মানুষেরা হেসে কথা বললে, তাদের কি আরও বেশি সুন্দর লাগে দেখতে? কে জানে?

- হ্যাঁ। আমি পার্ক স্ট্রিটে থাকি।
- যাক একদিনের মত তাহলে কথা বলার সঙ্গী পাওয়া গেল। আমার বাড়ি সাউথে। লেক গার্ডেন্স। আমি উমা।
- অয়ন। অয়ন রায়। গোয়ালিয়র মেডিক্যাল কলেজের সেকন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট।
- বাহঃ । নামের সাথে ধামটাও ফ্রি। আমার নামটাতো বললামই, উমা। উমা রায়। আগ্রায়ে একটা কলেজে ফিল্ম স্টাডিজ্ নিয়ে পড়ছি। আমিও সেকন্ড ইয়ার।
- বাহঃ দারুন তো। ফিল্ম স্টাডিজ্..... খুব ভাল ক্যারিয়ার। কাতারে কাতারে কত লোক যে মিছিলে হাঁটার মত শুধু হয় ডাক্তার নয় ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য ছুটছে। কজন যে সত্যি এগুলোকে ভালবেসে পড়তে আসে ভগবান জানে...
- আর ভালবেসে যারা কিছু করতে চায় জীবনে, ভগবান পরিক্ষা বোধহয় তাদেরই বেশি করে নেয়...

উমার গলাটার মধ্যে একটা ব্যাতিক্রমী ব্যাপার লুকিয়ে আছে। ভীষন গম্ভীর অথচ অদ্ভুত মিষ্টি সেই আওয়াজ। না শুনলে এর থেকে ভাল লিখে বোধহয় বোঝানো যাবে না।

সেই গলায়েই কি কোথাও আটকে থাকা পুরোনো বিষাদ ধরা পড়ল?


                                  ৫


ট্রেন সময়ের আগেই এগোচ্ছিল। তবে হঠাৎ করে কুয়াশার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারনে মাহ্বা স্টেশনে দাড়িয়ে আছে প্রায় এখন কুড়ি মিনিট ধরে। 

আর আলাপ জমে গেছে অয়ন ও উমার। অপরিচিত, থেকে পরিচিত, এবং এখন ক্রমেই বন্ধু হওয়ার পথে তারা। পাঠকের মনে হতেই পারে বন্ধু শব্দটা এতই কম দামি? ঘন্টা দুয়েকের পরিচয়ের মধ্যেই বন্ধু হয়ে যাওয়া?

ভাবনাটা আসা আসলে ঠিক। আজকের সময়ে সত্যিই বন্ধু বা বন্ধুত্ব, এই শব্দগুলোর মূল্য কমে গেছে। তাই হয়তো মানুষ আরও বেশি করে বন্ধু খোঁজে। তাই হয়তো একটু মনের মিল পেলে, বা যদি কারোর কাছে নিজের থেকে লুকিয়ে রাখা 'নিজে'টাকে যদি প্রকাশ করা যায়... তাকে বোধহয় আমরা বন্ধু ভাবতে শুরু করি।

- বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসা যাক? ট্রেন মনে হয়না এখন সহজে ছাড়ছে।

অয়ন কে জিগ্যেস করে উমা। আপাতভাবে শান্ত, গম্ভীর মেয়েটা আসলে খুবই প্রাণোচ্ছল এবং হাসি খুশী। জীবনের নিয়মে, তার ঘাত, প্রতিঘাতেই বোধহয় সে অন্য একরকম মুখোশ পড়ে, অন্য একজন মানুষ হয়ে বেঁচে থাকে।
তবে অয়নের সাথে সে স্বাভাবিক কি ভাবে হচ্ছে?
কেন হচ্ছে?

অয়ন ও উমার মধ্যে এইটুকু সময়েই অনেক কথাবার্তা হয়েছে। ক্যারিয়ার নিয়ে, পরিবার নিয়ে, জীবন ও বন্ধুদের নিয়ে, আর সর্বোপরি নিজের বাড়ি, শহর ছেড়ে বাইরে থাকার কষ্ট নিয়ে।

কথায় কথায় অয়ন জানতে পেরেছে উমার জীবনের সব স্ট্রাগলের কথা। স্রোতের বিরুদ্ধে হেঁটে সে ফিল্ম নিয়ে পড়ছে। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে, নিজের স্বপ্নের সাথে আপোষ না করে আজ সে সম্পূর্ণ ভাবে নিজের মেধায় স্কলারশিপে পড়ছে। তার বাড়ি থেকেও আজ আর কোনো আপত্তি নেই। তবে অতীতের ঘা মাঝে মাঝে ব্যাথা দেয় বৈকি।
উমাও জেনেছে অয়নের কথা। জয়েন্ট ফ্যামিলিতে বড় হয়ে ওঠা থেকে তার গোয়ালিয়রে থাকা বা একা বাঙালি ছাত্র হওয়ায় সিনিয়রদের অতিরিক্ত র‍্যাগিং এবং তার ফলে হওয়া ডিপ্রেশনের গল্প। 

প্রশ্ন আসতেই পারে যে স্বল্প পরিচিতিতে এইসব কথা বলাও সম্ভব? 
হ্যাঁ সম্ভব। আসলে মানুষ নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারলে হালকা বোধ করে। কিন্তু সবাইকে তো আর সবকিছু বলা যায় না। তাই এমন কোনো মানুষকেই বলা হয়তো ভাল, যে তাকে জাজ্ করবে না।
বা হয়তো আর একটা উত্তর হতে পারে। সেটার কথা আগেই বলেছি। 

ওরা যে বন্ধু হয়ে গেছে...


                                   ৬


-আর বলো, জীবনের কথাতো অনেক হল... প্রেম-ভালবাসার খবর কি?

কুয়াশামাখা স্টেশনটায় হাটছিল ওরা দুজন। ট্রেন এখনো দাড়িয়ে। আচমকা আসা এই বাউন্সারে অয়ন এক্কেবারে কাত।

- জীবনে ওসবের কোনো সিনই নেই। নেড়া বেলতলায় একবার গেছিল। আর মাথায় বেল পড়ে সে একেবারে রক্তারক্তি অবস্থা। তারপর থেকে গাছ, আই মিনে ওদের থেকে একটু দুরেই থাকি...

- আচ্ছা, তাহলে তো তোমার থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে...
হাসতে হাসতে বলে উমা... 
আর এই হাসিটাতেই হঠাৎ কি বুকটা কেপে উঠল অয়নের? হাটুজোড়াও কি একটু হলেও কাঁপল?
গালদুটো লাল... ঠান্ডায়? নাকি?

ট্রেন সিগনাল পেয়ে গেছে... কাজেই উত্তরটা অয়নের দেওয়া হয়ে ওঠা হলনা। ওরা এগিয়ে চলল নিজেদের বগির দিকে.....

...

- তা বললেনা তোমার বেল গাছের কথা? প্রশ্নসূচক চোখে তাকিয়ে জিগ্যেস করে উমা।

দুপুর গড়িয়ে সময় এখন বিকেলের পথ ধরেছে। পরের স্টপেজ এলাহাবাদ বা অধুনা প্রয়াগরাজ।
বড়দিন আসতে আর কয়েক ঘন্টা। গোধূলি বেলার প্রাক্কালে এখন সময় অতীত জানার, স্মৃতির সাগরে ডুব দেওয়ার...

                                 ৭


-ক্লাস নাইনে তাকে প্রথম দেখি। টেনে ভাললাগা এবং ভালোবাসার শুরু। আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব এবং শেষে দুইতরফা ভালবাসা। ইলেভেন থেকে ওই সো কল্ড রিলেশনশিপ। ভালোই চলছিল। এমনকি টুয়েলভের ফাইনালের পরও। তারপরে আমি গোয়ালিয়র চলে আসি। সম্পর্কটা বদলে গেল লং ডিস্টেন্সে। তাও ঠিক ছিল। এরপর শুরু হল কলেজে র‍্যাগিং। মানসিক ভাবে আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। এবং তার মধ্যেই একদিন হটাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতন এক কমন ফ্রেন্ডের মাধ্যমে খবর আসে যে ও চিট করছে আমায়। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। তবে সেই ছেলেটি আমার ছোটোবেলার বন্ধু ছিল। মানসিক ভাবে ভেঙে তো গেছিলামই, তারপর খবর নিয়ে জানলাম সব কথাই সত্যি। প্রায় সাত মাস ধরে সে এরাম দুই নৌকায় পা দিয়ে ছিল।

তারপরের গল্প খুব সোজা। একজন প্রফেসর এখানকার আমায় খুব স্নেহ করেন। তিনি সব শুনে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে ট্রিটমেন্ট করার ব্যাবস্থা করে দিলেন। বাড়িতে কিচ্ছু না জানিয়ে সমস্ত খরচা নিজের কাধে নিলেন। তার নির্দেশে শুধু আমার ওপরেই না পুরো ব্যাচের ওপরই ঘটা চলা র‍্যাগিং কমল।

- হুউউউম বুঝলাম। সব হাসির পিছনে কত গল্প লুকিয়ে থাকে...তাই না?
- তোমার গল্পও আছে নাকি? থাকলে বলতে পারো... অনলি ইফ ইউ ওয়ান্ট...
- কার জীবনে গল্প থাকেনা বলো... আর না বলার মতন তো কিছুই না....
আগের বছর বড়দিনে ছুটির ঠিক আগে একটা ছেলে প্রোপোজ্ করেছিল। আমি চিরকালই খুব ইন্ট্রোভার্টেড ধরনের। ছোটো থেকে বাবা, মা দুজনেই সকালে চাকরি করতে বেরিয়ে যেত। ভেবেছিলাম প্রেমিকের থেকেও কোনো হয়তো ভাল বন্ধু পেলাম।
৬ মাস হতেনা হতেই তার মন পাল্টাতে লাগল। আমি তখন হয়ে গেলাম অনেক দূরের মানুষ।
তবে মনের সেই ক্ষত আজও মোছেনি... 
তারপর থেকে একটু বেশিই চুপচাপ হয়ে গেছি।

নিজের কোন দোষ ছাড়াই কষ্ট পেয়ে যাই...।


                                  ৮


উমার চোখে এখন চশমা নেই। চশমা ছাড়া যেন তাকে আরও বেশি মোহনীয় লাগছে। মায়াবী ওই চোখজোড়া আরও বেশি মুগ্দ্ধকর লাগছে। সন্ধ্যা নামার ঠিক আগের মুহুর্তে সেই চোখজোড়ায়ে স্পষ্ট জল দেখতে পায় অয়ন। ওর মনে হয়ে মুছে দেয় সেটা...। না, অয়ন নিজেকে সংযত করে। জলের বোতল এগিয়ে দেয় উমার দিকে, এবং বলে...

- উমা প্লিজ্ কেঁদোনা। উমাদের চোখে জল মানায় না।

চোখ মুছে হাসে উমা।

ট্রেনের বাইরে, না ওদের মনে... গোধূলিবেলাটা কোথায় আজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে?

- ওই আকাশের দিকে তাকাও উমা। আর মনে করো আজ সকালের সেই ভয়ংকর কুয়াশাকে। তার সাথে এই আকাশের কত তফাৎ তাইনা? অথচ দুজন কিন্তু একই। আমাদের জীবনটাও বোধহয় ঠিক এরকমই। কুয়াশা একবার হলেও আসবে। আর সেই কুয়াশা কেটে রোদও নিশ্চিত ভাবেই বেরোবে...।

আরও কিছু বলে যায় অয়ন। শুনতে পায়না উমা। অবাক চোখে শুধু একভাবে তাকিয়ে থাকে সে অয়নের দিকে.... এরকম কথা বহুবার বহুজনের কাছে শুনেছে সে। তবু আজ অয়নের মুখে শুনতে যেন ভাল লাগে।

শুধু অয়নের কথা শুনতেই ভাল লাগে? বাকি আর কোনো ভাল সংক্রান্ত শব্দ নেই?

সত্যিই কি নেই? নাকি তাদের আসার সময় এখনো হয়নি?


                                 ৯


গানের লাইন ধরে বলতে গেলে, 'এখন অনেক রাত'। ঘড়িতে এখন দুটো বাজে। পৃথিবীও পা রেখে দিয়েছে ২৪শে ডিসেম্বরের ক্রিসমাস ইভ থেকে ২৫শে ডিসেম্বরে।

অয়ন উঠে পড়ল। ট্রেনে এমনিতেই তার ঘুম আসেনা। আর আজ তো বড়দিনের আগের রাত।

ঘুম ভেঙে গেল উমারও। এবং উল্টোদিকের সিটে অয়নকে না দেখতে পেয়ে বুকের একটা জায়গায় হঠাৎ যেন কেমন একটা ব্যাথা হতে শুরু করল।

এই ব্যাথাটাকে চেনে উমা। আচমকা কোনো মানুষের থেকে দুঃখ পেলে ওর এই ব্যাথাটা হয়।
তবে হঠাৎ তা অয়নের ক্ষেত্রে হচ্ছে কেন?

সিট ছেড়ে এগিয়ে এসে গেটের সামনে এসে অয়নকে দেখতে পেল উমা। ব্যাথাটাও কি কমে গেল?

- না ঘুমিয়ে এখানে এই ঠাণ্ডায় দাঁড়িয়ে আছো?

হিমেল রাতের নিশ্চুপ ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে উমার গলার আচমকা আওয়াজে চমকে উঠলো অয়ন।

- ঘুম আসছিল না। তাই ভাবলাম বাইরে এসে দাঁড়াই।

- প্রাক্তনের কথা মনে পড়ছে নাকি?
- না, না। তাকে অনেকদিন আগেই মনের ঘর থেকে বের করে দিয়েছি।
আসলে বড়দিনের আগের রাতটা ছোটবেলায় চেষ্টায় থাকতাম জেগে থাকার। গিফট নিয়ে সত্যিই সান্টা আসেন না বাবা, তা জানার অদম্য কৌতূহলে জেগে থাকতে চাইতাম। অথচ প্রতিবছরই সেইদিনটা বোধহয় তাড়াতাড়ি ঘুম আসত। আর সকালে উঠে বালিশের পাশে নতুন মোড়কে কোনো কিছু রাখা থাকত। আজ রাতগুলো জেগে থাকতে পারি, কিন্তু সেই উন্মাদনা, বা আবেগ কোনোটাই নেই। তাও জেগে থাকি এই রাতটা। ভালো লাগে বেশ...।

সময়ের সাথে শীত বাড়ছে। রাত পেড়িয়ে ভোর হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে গল্পেই কেটে যাচ্ছিল রাতটা।
ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই বাড়ছিল কুয়াশার দাপট।

- জানিনা কেনো, কুয়াশাকে ভীষন ভালো লাগে আমার। ছোটবেলা থেকেই। কাল থেকে ভাল লাগাটা বোধহয় আরও বেশি করে ভাল লেগে গেল।

উমা হাসল। 
- তা ঠিক। কালকের পর থেকে কুয়াশার প্রতি আকর্ষণটা আমারও মনে হচ্ছে যেন বেড়ে গেছে।

ট্রেন বরাকর স্টেশন ছাড়াল। তার মানে বাংলায় আমাদের গল্প ঢুকে পড়েছে।

ট্রেন থেকে নামার জন্য আর মাত্র কয়েক ঘন্টা...


                                  ১০


একটা অদ্ভুত ছটফটানি অনুভব হচ্ছে অয়নের যত হাওড়া স্টেশন কাছে আসছে। কিসের তা? কাছের কাউকে হারানোর? উমা ওর এত কাছের কি করে হল? তাহলে কেনই বা তাকে হারানোর ভয় গ্রাস করছে ওকে?

মনের অবস্থা ভাল নয় উমারও। অয়নের মতন তার সাথে এত অল্প পরিচয়ে কেউ বন্ধু হয়নি। এত ভাল করে ছোট ছোট সব বিষয়গুলো কে কেউ বোঝায়নি... কিন্তু শুধু সেটুকুতে থেমে গেলেই হত। বুকের ওই চেনা ব্যাথা টা বার বার কেন হচ্ছে?

হ্যাঁ। আপনি যেটা ভাবছেন সেটাই। বন্ধুত্ব থেকেই কোথাও হয়তো ভালবাসার সুচনা হয়ে গেছে। 

মন ভাঙা, প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে লড়াই করতে থাকা দুই জীবনপথের যাত্রীর মাঝে এসে পড়েছে ভালবাসার উষ্ণতায় মোড়ানো একরাশ কুয়াশা। বাড়ি ফেরার পথের সঙ্গী। 

ভালবাসার ব্যাপারটা নাহয় বোঝা গেল... তবে তারপর? মুখ ফুটে তা কে প্রথম বলে উঠতে পারবে? দেখা যাক তাহলে...
ট্রেন কিন্তু বর্ধমান ঢুকে গেছে প্রায়...


                                     ১১


- হটাৎ আমাদের বুকে ব্যাথা হয়ে কোনো কারন ছাড়া জানো উমা? সেটা কিন্তু শরীর সংক্রান্ত নয়। মন।

অয়নের কথা শুনে চমকে উঠল উমা। ছেলেটা মাইন্ড রিডিং জানে নাকি? অয়ন আরো বলতে থাকল...

-আমার যেমন এখন হচ্ছে। কেন হচ্ছে বোধহয় আন্দাজ করতে পারি। এই ব্যাথা আমি এর আগে দুবার অনুভব করেছিলাম। প্রথম যখন ভালবেসেছিলাম। আর যখন সে দূরে চলে গেছিল...

- আর এখন কোনটার জন্য হচ্ছে তাহলে?
- দুটোই। ভালবাসার অনুভূতি। তবে এবার যেন একটু অন্যরকম। সে আগের থেকে অনেক শান্ত, পরিণত। আর তারই সাথে আছে তাকে পাওয়ার আগেই হারিয়ে যাওয়ার ভয়। ভালোবাসার অনুভূতিটা যেমন ভীষন, ভয়টাও তাই...

- বাহ:। খুব সুন্দর কথা বলো তুমি। তা সে কে?
- উত্তরটা তুমি জানোই। তবু যদি একটু কাব্যিক ভাবে বলতে হয়..
তার মায়াবী মুখ যেন কুয়াশাতে ভরা,
তার কালো দুই ফ্রেমের মাঝে আমি খুঁজি ভালবাসা।

উমা তার কালো ফ্রেমের চশমাটা খুলে রাখল। সদ্য ওঠা রোদে তার খয়েরি চোখে আজ অনেকদিনের হারানো ঔজ্জ্বল্য মনে হয় যেন ফিরে পেয়েছে।হাওড়া জংশন আর কিছুক্ষণ।


                               .....


- তাহলে স্যার, আবার একবার লং ডিস্টেন্সের চক্করে পড়তে যাচ্ছেন?

হাতে অয়নের দেওয়া একটা গোলাপ যা উমার চোখের আড়ালে সে আসানসোল স্টেশন থেকে কিনে এনেছিল, সেটা ধড়েই হাসতে হাসতে জিগ্গেস করে উমা। হাওড়া এসে গেছে প্রায়।

- গোয়ালিয়র থেকে আগ্রাটাকে লং ডিস্টেন্স বলা যায়না ম্যাডাম। আর ভালোবাসাটা খাঁটি হলে সব ডিস্টেন্সই ছোটো হয়ে যায়।
-তা ঠিক। তবে সত্যিই ভাবিনি যে বাড়ি ফেরার পথে এরকম আচমকা ভালোবাসার স্টেশন রাস্তায় এসে পড়বে।
- আজ ক্রিসমাস। হয়তো ভগবান যিশু চেয়েছিলেন, তাই দুই ভাঙা মন জোড়া লাগল...


                                .....

-তাহলে ২৮শে চিড়িয়াখানা,  ৩০শে ইকো পার্ক। ৩১শে তোমাদের বাড়ি, আমাদের বাড়ি, আর ফাইনালি রাতে পার্ক স্ট্রিট।
-একদম, আর তারপর দিন একই ট্রেনে আবার ব্যাক টু দ্যা 'হার্ট অফ ইন্ডিয়া'।
- হ্যাঁ। আমি আজই টিকিটের ব্যাপারটা গুছিয়ে নেব। ওটা নিয়ে চিন্তা করো না। 

                                ......

কথাগুলো বলে  ট্যাক্সিস্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে চলে উমা এবং অয়ন। বড়দিনে আমাদের ভালবাসার শহর কলকাতায় জুড়ে গেল আরও দুই ভেঙে যাওয়া মন। এগিয়ে চলে তারা বাড়ির দিকে,শহরের দিকে, বা বলা ভাল জীবনের দিকে। ওদেরকে এই ছুটির মরশুমে আমরা আর ধাওয়া করব না। ওরা নিজেদের মতই নাহয় বড়দিন, নিউ ইয়ার উদজাপন করুক।

তবে বড়দিনের সকালে যখন কেক খেয়ে এই লেখা শেষ করছি এটুকু বলে যাই, উমা ও অয়ন আবার ফিরবে। হয়তো আজ নয়, কাল নয়। তবে এই কলমে তাদের নিয়ে আরো লেখা আসবেই।

(কুয়শামাখা শীতের সকাল, উমার খয়েরি দুই চোখের মনি, ও ভালবাসার অনুভূতি বাদ দিয়ে, এই গল্পের সবই কাল্পনিক)

No comments:

Post a Comment

I Owe You A December

For those, Who still silently cries alone in the bed, when all the switches go off– May you find your light soon, and for foreve...