সময় প্রায় রাত দুটো। হিমেল আকাশে আজ তারার মেলা। প্রতিদিনই একবার রাতে ছাদ থেকে ঘুরে আসি ঘুমানোর আগে, এতো তারা অনেকদিন পরে দেখলাম।
কোনো ছোট্ট বাচ্চার এই আকাশ দেখে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে এত তারা আজ একসাথে কেন? "ওরাও কি ভারতের বিশ্বজয় দেখবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে"- এমন ভাবনাও আসতেই তো পারে।
যদি সেই ছেলে বা মেয়েটা একটু ক্রিকেটপ্রেমী হয় এবং তার ছোটবেলায়ে দাদু-ঠাকুমার কাছে গল্প শুনে থাকে, তার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে... ওই নক্ষত্রদের মাঝে কোথাও কি বিরাট, শামি, সিরাজ- তাদের বাবারাও আছে? তারাও নিশ্চয়ই অপেক্ষায় আছে তাদের দেশের বিশ্বজয়ের, তাদের সন্তানদের বিশ্বজয়ের।
কলকাতা থেকে ৪০ কিলোমিটার দুরে যেই শহরতলি থেকে বসে এই লেখাটা লিখছি, তার সাথে আহমেদাবাদের মিল বড় অল্প। ভাষা, পোশাক, সংস্কৃতি, সব আলাদা।
নাকি ভুল বললাম?
আজ তো ভারতের কোনো শহর, গ্রাম থেকে কাউকে আলাদা করা যাবেনা। সমগ্র ভারত আজ মন্দিরে, মসজিদে, চার্চে, গুরুদ্বারে একটাই তো প্রার্থনা করবে... বিশ্বজয়ের।
আর ঠিক এখানেই জিতে যায় ক্রিকেট।
যা রাজনীতি পারেনা, লাইনের পর লাইন নেতাদের, ধর্মগুরুদের ভাষন পারেনা, তা পেরে দেখিয়ে যায় ক্রিকেট। সমস্ত ধর্ম, থেকে মানুষ, সবাইকে এক করে দিয়ে যায়।
২মাস ধরে চলা এই উৎসবের শেষ পাতায় শেষ কবিতাটা আজ লেখা হবে। অনেক নতুন লেখা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের। ম্যাক্সওয়েলের মহাকাব্য থেকে কোহলির কীর্তি, ম্যাথেউসের টাইম্ড আউট থেকে আফগানদের স্বপ্নউড়ান বা এক বিদেশি অধিনায়ক, কেন উইলিয়ামসনের জন্য ভারতীয়দের চোখের জল ফেলা।
আর এখানেই জিতে যায় ক্রিকেট ।
লেখকের প্রথম ক্রিকেটিয় স্মৃতি বলতে চলে আসে ২০১১-র ফাইনাল। বিকেলবেলার আঁকার ক্লাস থেকে ফেরার পথে স্যার সবার গালে তিরঙ্গায়ে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন। এবং বাড়ি ফিরে কিছুক্ষণের সকলে মিলে একসাথে বসে খেলা দেখা। কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎ উৎসবের আমেজ। বাড়ির বড়রাও পাগলের মতন আনন্দ করছে, হাসছে; পাড়ায় বাজি ফাটছে, সকলে মিলে রাস্তায় বেরিয়ে যাওয়া। এবং অবশ্যই কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে আমাকে নিয়ে কোলে করে মাতামাতি করা। খেলার কিছুই বুঝতাম না তখন। তবে এটা বুঝেছিলাম যে এই খেলাটা কোনোভাবে সকলকে হাসাতে পারে, আনন্দ দিতে পারে।
২০১৯। ক্রিকেটটা মোটামুটি বুঝি। সেই বিশ্বকাপে এটা বুঝলাম যে ক্রিকেট হাসাতে যেমন পারে, কাঁদাতেও পারে। আনন্দ যেমন দিতে পারে, মনও ভাঙচুর করতে পারে। কোথাও তার প্রভাব যেন ভেঙে যাওয়া প্রথম প্রেমের মতো। চেষ্টা করেও ভোলা যায় না। যন্ত্রণা মনে গেঁথে থাকে।
তবে ক্রিকেটই বোধহয় আবার দ্বিতীয় সুযোগ দেয়।
২০০৩-এর বিশ্বকাপ ফাইনালের সময় আমার জন্ম হয়নি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে পরিমান প্রতিশোধের স্পৃহা দেখছি, তাতে কোথাও যেন সেইদিনের ফাইনালের রয়ে যাওয়া ক্ষতটা অনুভব করা যায়।
আজ ফের সুযোগ এসেছে। ক্রিকেট দেবতা মুখ তুলে চেয়েছেন। ২০ বছর আগের রাতের বদলা নেওয়ার সুযোগ আজ। ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া। ফের ফাইনালে মুখোমুখি।
ক্রিকেট সুযোগ দেয়। প্রত্যাবর্তনের বা প্রতিশোধের সুযোগ দেয়।
জীবনও তাই-ই বোধহয়।
আজ ২০০৩ এর ক্ষত শুকিয়ে যাক।
হেরে যাওয়া প্রেমিকদের চোখের জল আজ মুছে যাক।
শেষের কবিতায় আজ লেখা থাকুক না বিশ্বজয়ের মহাকাব্য।
নতুনের ফাইনালে আজ পুরোনোর বদলা হোক না!
নিল রঙে রাঙিয়ে যাক শেষ পাতাটা।
রাঙিয়ে যাক গোটা ভারতবর্ষ।
ফাটাফাটি হয়েছে
ReplyDelete