সৃজিত মুখার্জী পরিচালিত 'দ্বিতীয় পুরুষ' ছবির একটি বহুল প্রচলিত সংলাপ ছিল বাংলা ভাষা ও মটন কষা নিয়ে কোনো প্রকার ফাজলামি বা তামাশা না করার বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক তথা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এই চেনা ডায়লগটিই রসিক বাঙালি একটু নিজের মতো করে বদলে নিয়েছে। 'বাংলা ভাষা'র পরিবর্তে নতুন শব্দ হলো, দুর্গাপূজা। মানে দুর্গাপূজো ও মাটন কষা– দুই নিয়েই বাঙালি কোনো রকমের অযাচিত ও অনধিকার চর্চা চাইছে না।
সম্প্রতি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) নামক স্বঘোষিত একটি ধর্ম রক্ষাকারী দলের বাংলার দূর্গাপূজা সংক্রান্ত নানাবিধ ফতোয়া জারি নিয়ে বিতর্কের ঝড় বয়ে গেছে। জাতীয় স্তরে বিভিন্ন সময়ে বহু বিতর্কিত মন্তব্য ও অশোভনিয় আচরণের জন্য সংগঠনটি খবরের শিরোনামে এলেও, বঙ্গে এদের উপস্থিতি ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের পূর্বে নোটার পাওয়া ভোটের থেকেও উপেক্ষণীয় ছিল। এরকম একটি প্রতিষ্টান যখন হঠাৎ স্রেফ শাসক ঘনিষ্ঠ হওয়ার দরুণ দুর্গাপূজা কি করে পালন করা হবে সেই সংক্রান্ত নির্দেশনামা প্রকাশ করে, স্বাভাবিকভাবেই তা প্রশ্ন তোলার জায়গা তুলে দেয়। তাদের কয়েক দফা নিয়মাবলীর মধ্যে সবচেয়ে বেশী বিরোধিতা যদিও দেখা গেছে দুর্গা মণ্ডপের নিকটবর্তী এলাকায় আমিষ খাওয়া এবং থিম পুজো না করা নিয়ে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কথার রেশ ধরে রেখে যখন শাসকদলের নেতা-কর্মী, এমনকি আচমকা আবির্ভূত বিদ্বান হিন্দীভাষী ধর্মগুরুও বাঙালির আমিষ খাবারের দোষ সম্পর্কে অবহিত করতে ব্যস্ত, জনমানসে এ নিয়ে ক্ষোভ ক্রমে ঊর্ধ্বমুখী। বাঙালিদের কাছে এই অচেনা, অজানা এবং বাংলার ঐতিহ্য সম্পর্কে অনাহূত ব্যক্তিত্বদের শারদীয়া উদযাপন নিয়ে ভাষণ কেবল তাদের সংস্কৃতিতে অবাঞ্ছিত প্রবেশই নয়, সরাসরি আধিপত্যবাদের নিদর্শনও বটে। থিমের পুজো বা মাতৃপ্রতিমা বিষয়ক বিধি নিয়ে আলোচনা কম কারণ সেটি বাস্তবায়ন করতে রাজ্যের পর্যটন দফতর নিজে কত সক্রিয় হবে তা নিয়েই জিজ্ঞাস্য চিহ্ন রয়েছে, যেহেতু এর সাথে সরাসরি রাজ্যের পর্যটন শিল্প ও ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক তকমার বিষয়টি জড়িয়ে।
ইতিহাস, পুরাণ ও আবেগ– তিনই যদিও VHP তথা দুর্গাপূজোয় মেতে ওঠা নব্য মাতব্বরদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে তাদের ফতোয়া জারির পর থেকে কঠোর প্রতিক্রিয়া মিলেছে সর্বস্তর থেকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের নিয়ে ট্রোল ও মিমের যা বহর, মহালয়া অব্দি ওনারা স্টেটমেন্ট ক্ল্যারিফাই করতে করতে বোধহয় নিজেরাই অস্বিকার করবেন বর্তমান ফতোয়ার কথা! শাক্ত ও বৈষ্ণব পরম্পরায় পুজোর নুন্যতম পার্থক্য যারা জানে না, তাদের থেকে ধর্মজ্ঞান পাওয়া হেনস্তারই সমান। কাজেই পাল্টা হিসেবে এটুকু প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত কাম্য।
প্রতিষ্ঠা ইস্তক উত্তর ও পূর্ব ভারতে সক্রিয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ হয়তো জানে না, উত্তর-পূর্ব ভারত– বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের বেশীর ভাগ অংশে দেবীকে শক্তির প্রতীক হিসেবে শাক্ত মতে পুজো করা হয়। ভারতের অন্য সব প্রান্তের বৈষ্ণব মতের থেকে যা সম্পুর্ণ আলাদা। বাঙালিরা দেবীকে ঘরের মেয়ে ভেবে 'উমা' বা 'গৌরী' রূপে আরাধনা করে, যে বছরে একবার নিজের বাপের বাড়ি ফেরে। মেয়ে ঘরে ফিরলে বাঙালি পরিবারের ধারা অনুযায়ী তাকে স্বাগত জানানো হয়, যা কি না কখনোই উপবাস রেখে (উত্তর ভারতের নবরাত্রি উৎসব) বা নিরামিষ খাইয়ে হয় না। বাঙালিরা নিজে চরিত্রগত ভাবে নিরামিষভোজী নয়, তাহলে তারা ঘরের মেয়েকে কি করে নিরামিষ খাওয়াতে পারে? বা মেয়ে ফিরে আসার আনন্দে নিজেরাই বা সেটা কেন খাবে?
যদিও আজকের দিনে হাতে গোনা কিছু বনেদি বাড়ির পূজো বাদে কোথাও দেবীকে আমিষ ভোগ নিবেদন করা হয় না, বেশ কিছু পুরাণে কিন্তু রীতিমতো অনিরামিষ ভোগ দেওয়ার কথা লেখা রয়েছে। কালিকা পুরাণে উল্লেখিত দেবী দুর্গা ও মা কালীকে মহা প্রসাদ হিসেবে পশু (ছাগল ও অন্যান্য প্রাণী) বলী দেওয়ার কথা। মাংসের সেই ভোগ হতে হবে 'নিরামিষ'– এ ক্ষেত্রে যার মানে 'তামসিক'বিহীন, অর্থাৎ রসুন ও পেঁয়াজ বর্জিত খাবার। লোকমুখে এই প্রসাদটি 'নিরামিষ মাংস' নামে প্রচলিত হয়ে যায়। ১৬'র শতকে রঘুনন্দনের দুর্গাপূজাতত্ত্বে দুর্গাপূজায় আমিষ ভোগ দেওয়া সহ বিস্তারিত আচারবিধি সংকলিত হয়েছে; বাংলার পরবর্তী পূজাচর্চায় বলির মাংসকে পেঁয়াজ-রসুনবিহীন ভাবে রান্না করার যে নিরামিষ মাংসের ঐতিহ্য, তার সঙ্গে এই বৃহত্তর শাক্ত মতের সম্পর্ক রয়েছে।
যদিও পুরাণ বা ঐতিহাসিক এই তথ্যগুলো দেওয়ার প্রয়োজন খুব একটা নেই, VHP এবং স্বঘোষিত ধর্মীয় গুরুদের কপটতা প্রমান করা ব্যতীত। অধিকাংশ বারোয়ারি পুজোতে আমিষ ভোগ কোনোদিনই নিবেদন করা হয় না। পশুবলী মানবিক ও আইনি কারণের জন্য সময়ের সাথে বনেদি বাড়িগুলিতে বন্ধ বা প্রতীকী হয়েছে। আর ''মাতৃপ্রতিমার সামনে প্যান্ডেলে বসে বাঙালিরা আমিষ খায়''– এর থেকে অবাস্তব বোধহয় 'অ্যাকাউন্টে পনেরো লাখ টাকা ঢুকবে' কথাটিও লাগেনি। দুর্গাপূজোর আসল অবমাননা বোধহয় আদতে এই সমস্ত মিথ্যা প্রচারগুলোই।
সব শেষে প্রশ্ন ওঠে, এতো বড় একটি ধর্মীয় সংগঠন কি তাহলে পুরাণ জানে না? এ কেবলই তাদের বাংলার ব্যাপারে অজ্ঞতা? নাকি এই সব কিছুর মূল উদ্দেশ্য আসলে ধীরে ধীরে বাংলার উপর, বাঙালির উপরে উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি ও তাদের খাদ্যাভ্যাস চাপিয়ে দেওয়ার প্রথম প্রচেষ্টা? মাছ খাওয়া বন্ধ না হওয়ার মতো ক্রমাগত আশ্বাস দিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মধ্যেই যখন দুর্গাপূজোয় আমিষ খেতে দেওয়া হবে না বলে রোল উঠছে, সেই প্রসঙ্গে শাসক দলের নীরবতা বা একেক জন নেতা-নেত্রীর ব্যক্তিগত সমর্থন জল্পনাগুলি আরো উস্কে দিচ্ছে।
পৌরানিক বা ঐতিহাসিক তথ্য, সেল্ফ ডিফেন্সের জন্য কিছুই আর পড়ে নেই VHP'র কাছে। সংঘের চেনা ছক মেনে তাই মান ইজ্জত বাঁচাতে শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা 'আমরা-ওরা' করে শরৎ বন্দনায় 'হিন্দু' ও 'অহিন্দু' বিভেদ সৃষ্টি করার খেলায় নেমেছে। "ধর্ম যার যার, উৎসব সবার" স্লোগানটি বদলে দিয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এখন বলছে "ধর্ম যার যার, উৎসব তার তার"। এটি যদিও তাদের পুরোনো হাতিয়ার। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, ও গুজরাটের মতো রাজ্যে এর আগে তারা নবরাত্রির গর্বা ও ডান্ডিয়া অনুষ্ঠানে অহিন্দু কারোর আসা ঠেকাতে আধার কার্ড যাচাই করার ফতোয়া জারি করে শিরোনামে এসেছিল।
কিন্তু VHP ও সেই স্বঘোষিত ধর্মগুরুরা কোথাও গিয়ে হয়তো ভুলে যাচ্ছেন বাঙালির বৈশিষ্ট্য আজও তার সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের সন্ধিতে। যদি কেউ ভেবে থাকে ধর্ম দিয়ে বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে বাঙালি বিজেপির মতো দলকে ক্ষমতায় এনেছে, তারা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। তৃণমূলের দুর্নীতি ও অপশাসন ঠেকানোর জন্য পশ্চিমবঙ্গবাসী বিজেপিকে ক্ষমতাভার দিয়েছে। ধর্ম নিয়ে সুরসুরি বা বিভেদ লাগানোর জন্য নয়। যদি তারা মূল এজেন্ডা থেকে সরে গিয়ে বাঙালি অষ্মিতার উপরে আঘাত আনার চেষ্টা করে, বলা বাহুল্য এবার আর বঙ্গবাসী দীর্ঘ ৩৪ বা ১৫ বছর সময় নেবে না পরবর্তী বিকল্প বাছতে। স্বাধনীতা সংগ্রামে সবথেকে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া জাতি নিজেদের উৎসব ও সংস্কৃতি পালনের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলেরই নীতিপুলিশি যে মানবে না... তা আশা করি রাজনীতি ও ধর্মের দাদা- দিদিদের আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই।।
✍️ অনুরাগ
Ei kotha gulo Shasok dol o tader posha brain dead zombie gulo bujhle ar nijeder posha kichu nam vangano dhormio dol ar dhormo guru der kotha guloke fake narrative diye justify korte ashto na...
ReplyDelete