বিজলি সিনেমা ক্রস করে দেখা পাওয়া গেল কাঙ্খিত একটি চায়ের দোকানের। সাংবাদিকতার ছাত্র হিসেবে প্রথম অলিখিত পাঠ, 'মতামত খুঁজতে হলে, পশ্চিমবঙ্গে চায়ের দোকানের বিকল্প আগামী এক শতকেও পাওয়া যাবে না।' তা অচেনা, সদ্য কৈশোর পেরোনো দুজন ছেলেকে ক্যামেরা, মাইক নিয়ে দোকানের দিকে এগোতে দেখে আড্ডায় ছেদ পড়লো। অসন্তুষ্ঠ মুখে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টি আসতেই বন্দুক থেকে গুলির মতো ছিটকে বেরোল আপামর বাঙালির মনের প্রশ্ন– "ভবানীপুরের হাওয়া কি বলছে? এখানে তো এবার হাই-ভোল্টেজ লড়াই।"
দুপুরের কলকাতা চুপচাপ। মানুষও তাই। কলকাতাবাসী স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে নিজেদের মত প্রকাশে এবারে একটু বেশিই সংযমী। অনেক ব্যাখ্যা-বিবরণের পরে, মধ্যেবয়সী ক্রেতারা উত্তর দিলেন, "লড়াই ভীষণ হাড্ডাহাড্ডি"। অ্যাডভান্টেজ কে? রায় অসল শাসকদলের নেত্রীর পক্ষেই। কেন বলছেন এগিয়ে? "ঘরের মেয়ে, আজ থেকে তো দেখছি না"।
"ঘরের মেয়ে"– এই শব্দ-বন্ধনীই বাজি তৃণমূলের। তাদের চোখ বাঙালি ভোটে। প্রচারমাধ্যমেও তা-ই স্পষ্ট। আর প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপির লক্ষ্য, অবাঙালি ভোটব্যাঙ্ক। দক্ষিণ কলকাতার এই অঞ্চল 'মিনি ইন্ডিয়া" হিসেবে পরিচিত। ভারতের প্রায় প্রতিটি কোণার মানুষের বসবাস এখানে। নজরকারা সংখ্যায় তাদের ভোটার কার্ডও আছে।
মোট জন সংখ্যার প্রায় ৪০% অবাঙালি মানুষ। বাঙালি ভোটার ও সমান, ৪০%। এবং সংখ্যালঘু মুসলিম ভোট প্রায় ২০%। বিজেপি আশাবাদী অর্ধেকেরও বেশি বাঙালি ভোট এবার তাদের কাছে আসবে, সে বামের ভোটই হোক, বা মেরুকরণের রাজনীতি, কিংবা প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার জন্য। আর অবাঙালি ভোট তাদের সঙ্গেই আছে, ধরে নিয়ে এগোচ্ছে তার। অন্যদিকে শাসক দল ২০% সংখ্যালঘু ভোট নিশ্চিত ভেবে মাঠে নামছে, বাঙালিয়ানাকে পুজি করে বাকি ৪০ শতাংশের জন্য। তা বলে এমন নয় যে অবাঙালি ভোটে তারা নজর দিচ্ছে না। নেত্রীর হিন্দিতে হরফে ছাপানো 'বাংলা নিজের মেয়েকে চায়' পোস্টার চোখে পড়ছিলো ভালোই। বুঝি, দুই পক্ষই বেশ হিসাব কষে মাঠে নেমেছে।
হিসাব মিলবে সব? সব্জী বিক্রেতা দুই দিদির কাছে প্রশ্ন রাখি। উত্তরে লক্ষীর ভাণ্ডারের টাকা প্রাপ্তির কথা স্বীকার করলেও, সঙ্গে বলছেন, 'এবার কি হবে বোঝা যাচ্ছে না। সবাই সমানে সমানে মাঠে আছে'। দিদি নাকি দাদা? উত্তর দেওয়ার বদলে পারস্পরিক এক হাসি বিনিময় চলে নিজেদের মধ্যে...
কোনো তৃতীয় পক্ষ নেই? শুধুই দাদা vs দিদি? জানতে চেয়েছিলাম এক মধ্যবিত্ত গলির বাইরে সিপিএমের বন্ধ পার্টি অফিসের রেয়াকে বসা জনা তিনেকের কাছে। বাম- কংগ্রেসকে ধর্তব্যের মধ্যেই রাখলেন না। তাহলে কাকে রাখবেন? মুচকি হেসে তিনজনেই জানালেন তারা অন্য কেন্দ্রের ভোটার, এখানকার না। কিন্তু এখানে তো থাকেন, কি বুঝছেন? "কিছুই বোঝা যাচ্ছে না এবারটা। প্রচার সবাই করছে, কিন্তু খুব নিশ্চুপ সব কিছুই"। ৩৬° তাপমাত্রায় ঘাম মুছতে মুছতে উত্তর ফেরত আসে।
দুপুর শেষে বিকেল প্রায় আগত। গরম কমার তবু লক্ষণ নেই। হাঁটতে হাঁটতে যদুবাবুর বাজারের দিকে যেতে গিয়ে দুটি জিনিস নজর কাড়লো । অগুন্তি বহুতল, এবং 'কংগ্রেস'। বাড়ির থেকে বহুতলের সংখ্যা বেশি। ফলে বোঝা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো কেন ফ্ল্যাটের ভোট নিয়ে এবার একটু বেশিই চিন্তিত। জয়ের চাবি যে ওই ফ্ল্যাটের দরজাতেই লুকিয়ে আছে! কিন্তু কংগ্রেস? তাদের প্রার্থী নিয়ে কোনো মিডিয়ার কোনো প্রচার নেই, জনমানসে কথাবার্তাও বিন্দুমাত্র নেই। তবু, তিনি আছেন। প্রতিটা গলিতে, ইংরেজি- হিন্দি- বাংলা– সব মাধ্যমের বড়ো- ছোটো- মাঝারি, সব রকমের ফ্লেক্স ও ব্যানারে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন কংগ্রেসের প্রদীপ প্রসাদ। ফ্লেক্স- ব্যানারের সংখ্যার মতো যদি ইভিএমে 'হাত' পড়ে, প্রদীপ বাবু কিন্তু যাত্রা ভঙ্গ করে দিতে পারেন অনেকেরই। আর বাম প্রার্থী শ্রীজীব? উনি আছেন। কয়েকটি দেওয়ালে, তবে খুবই সামন্যভাবে – বাস্তবের এবং ফেসবুকের।
যদুবাবুর বাজারের সামনে এসে এক যন্ত্রাংশের দোকানে একের বেশি মানুষ থাকায় আবার সেই এক ঘ্যানঘ্যানে প্রশ্ন নিয়ে এগিয়ে যাই। কিন্তু এবার, উত্তরে বৈচিত্র। প্রথম জন জানালেন এই ওয়ার্ডটিতে গত ভোটে বিজেপি এগিয়ে। এইবারেও নিশ্চিত ভাবে তারাই জিতবে। সঙ্গে সঙ্গে বিরোধিতা করে উঠলেন পাশের জন। "এবারে দিদি সব ওয়ার্ডে বিপুল জনসমর্থন পাবেন"। মাইক এগোয়ে এবার স্বয়ং দোকানদারের কাছে। স্পষ্ট, দৃড় জবাব। "আপনাকে বলব কেন?"
এরপর আর কিছু বলার থাকে না। লেখারও না। পরন্ত বিকেলে নেতাজী ভবন মেট্রো স্টেশনের বাইরে বাঙালি দোকানের অবাঙালি 'গুলাব জামুন' ও 'সিঙ্গারা' খেতে খেতে শুধু মাথায় আসে সেই সব্জিওয়ালা দিদিদের শেষ কটা কথা...
"আমরা কিন্তু এই এলাকার ভোটার নই।"
"তাহলে কোথাকার?"
"****"
"ওখানে হাওয়া কেমন?"
"কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কাল 'এর সমর্থনে বিশাল মিছিল বেরোয়ে তো পরশু পাল্টা একই মানুষগুলোরে নিয়ে অন্য মিছিল। কে কিসের জন্য যাচ্ছে– খাবার না টাকা, আর মনে চুপচাপ কি ভাবছে; কে-ই বা জানে..."
'চুপচাপ' সব খুব। পশ্চিমবঙ্গের অতি পুরোনো রাজনৈতিক স্লোগান আছে এই 'চুপচাপ' শব্দ নিয়ে। "চুপচাপ, __'এ ছাপ "। এবারেও ভবানীপুর সহ বাংলার অনেক জায়গায় এই বাক্য চোখে পড়লো।
সেই চায়ের দোকান থেকে যখন বেরোচ্ছিলাম, এই চুপ থাকা নিয়ে অভিযোগও করেছিলাম দাদাদের। তাতে ওনারা হেসেছিলেন । মাপা হাসি। অর্থবহ। কি সেই অর্থ?
জানা যায় না...
সব হাসি আর নিস্তব্ধতার উত্তর সত্যিই তো, "আমাদের সবাই বলবে কেন?"
~ অনুরাগ বলছি
No comments:
Post a Comment