Monday, 30 September 2024

..... এবং আমি

ঘড়ি বলছে, রাত প্রায় এখন আড়াইটে। বসন্ত চলে যাওয়ায় গায়ে যে একটা হালকা শিরশিরানি ভাব হয়, ওটাও আর নেই। ঘুম আসছে না দেখে অগত্যা চলে গেলাম ছাদে। হ্যাঁ, এটা আমি প্রায়ই করি। দুর্ভাগ্যবশত, ভুতের ভয় আমার একদমই নেই। কাজেই গা ছমছমে অনুভূতিটা পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। গভীর রাতে এরকম ছাদে একা হাটতে আমার ভাল লাগে। ভিষন ভাবে। বিশালাকার ওই আকাশটার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে সমর্পণ করে দিই, ভালোলাগা, মন্দলাগা, সবকিছু। ও জানিয়ে রাখি, আমাদের কিন্তু বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। চাঁদ, তারা, মেঘ, আকাশ- এরা সবাই-ই আমার বেশ ভালো বন্ধু।

কি? পড়ে অবাস্তব রূপকথা মার্কা ভাট বকা মনে হচ্ছে? তা মনে হতেই পারে। তবে এর সবকিছুই কিন্তু সত্যি। সারাদিনব্যাপী সবকিছুর গল্প আমার ওদের সাথেই। সরল থেকে জটিল, সমস্ত অনুভূতি প্রকাশ ওদের কাছেই করি। ওরা শোনেও। কিছু না বলেও অনেক সময় অনেক পরামর্শ, নির্দেশ দেয়। কঠিন রাস্তায় টিকে থাকার ফর্মুলা দেওয়া হোক বা সম্ভাব্য হোচট খাওয়ার বস্তুগুলো চিনিয়ে দেওয়া, সবেতেই এই বন্ধুরা খুব যত্নশীল।

তবে আজকের লেখাটা কিন্তু ওদের নিয়ে নয়। এই লেখাটা হলো ওইসব গল্প আর অনুভূতিগুলোকে নিয়ে।



এই লেখাটা আমি শুরু করেছিলাম অনেকদিন আগে। তখনও স্কুলের গন্ডী পেরোইনি। উচ্চ মাধ্যমিক এবং কলেজের প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে ঘরে বেকার বসে থাকা অবস্থায় (বা হয়তো তখনও সব পরীক্ষা শেষ হয়নি সব... আজ আর ঠিক মনে নেই), শুরু করেছিলাম লেখাটা। সত্যি বলতে আজ একদমই মনেও নেই, যে কিসের উপরে ভিত্তি করে বা কি নিয়ে লিখব ভেবে এটায় হাত দিয়েছিলাম।

তবে যাইহোক, ভুলে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া একটা জিনিস যখন মনে পড়েইছে... তখন এবার অন্তত শেষটুকু করা উচিত।

এরকমই, সব হারিয়ে যাওয়া জিনিসগুলো... মানুষগুলোকে, যদি আচমকা ফিরে পাওয়া যেত...!

মার্চ মাসে সম্ভবত শুরু করা একটা লেখা শরতের সন্ধ্যায়, দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে শেষ করতে এসে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। গত ছটা মাসে অনেক কিছু বদলে গেছে।

স্কুল থেকে কলেজে উঠেছি। ছোট্ট মফস্বলে বড়ো হতে হতে, হঠাৎ করে এখন রাজপথের ধুলো চিনছি। কিছু নতুন বন্ধু, পরিচিতজন হয়েছে, আর কিছু পুরোনোজনেরা থেকে গেছে। এই থাকা, না থাকার ব্যাপারটাও ভাবতে বসলে অবাক লাগে... এমন অনেকের সাথে এখনও ভালরকম যোগাযোগ থেকে গেছে, যাদের সাথে ভাবিইনি কোনোদিন পরিচয় হবে; আর বেশ কিছু দীর্ঘদিনের চেনা মানুষেরা, কিরম করে যেন আজ এক্কেবারে অচেনা হয়ে গেছে।

এরই মধ্যে বেশ কিছু ভুল করে নিজের স্বপ্ন নিজেই খানিক ভাঙলাম। সেসব থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরেও দাড়ালাম খানিক বটে। বড় হওয়ার এই এক মজা... মন ভাঙলেও, আমরা কান্না চাপতে শিখে যাই, আর চেপে যাওয়া কান্নায় ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের মন্ত্রটা বোধহয় সহজেই আত্মস্ত করা যায়।

বদলাতে দেখলাম সমাজটাকেও। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার বিষয়টা যে শুধু পাঠ্যবইয়ে পড়ে ভুলে যাওয়ার মতন বিষয় নয়, তা আমাদের মনে পড়ল, এক অপরিচিতা চিকিৎসক দিদির রাতের অন্ধকারে সরকারি হাসপাতালে ধর্ষিতা হয়ে খুন হওয়ার পর। নিকৃষ্টতম এই অপরাধগুলোর আঁচ যে যেকোনো মুহুর্তে এবার নিজেদের ঘরেও পড়তে পারে বুঝে, একটা গোটা জাতি কে বিক্রি হওয়া মেরুদণ্ড ফিরে পেতেও দেখলাম।

এখনও যারা মুখ বুজে থাকেন, চুপ করে থাকেন, তাদের জন্য.... সহানুভূতি; এছাড়া আর কোন শব্দটাই বা ব্যাবহার করতে পারি?

ভাবলে অবাক লাগে, রাগ হয়, কষ্ট হয়... যে যবে আমি এই লেখাটা শুরু করেছিলাম... সেদিন এবং তার পরেও অনেকদিন ওই দিদিটা কিন্তু বেঁচে ছিল।

মাঝের সময়টুকুতে না জানি তাঁকে কি না কি সহ্য করতে হয়েছে!


লেখার মাঝেই পুরোনো বন্ধুদের বহুকাল পরে আমায় হঠাৎ মনে পড়ায় ভার্চুয়াল আড্ডার ডাক আসে। সেসব মিটিয়ে, ছেড়ে যাওয়া স্মৃতিদের মুহুর্তখানিকের সঙ্গী করে আসতে আসতে, দেখি একেবারে গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা আবার সেই আড়াইটে পাড় করে এগিয়ে চলেছে...। তবে আজ আকাশে আর চাঁদ বা তারা নেই। শরতের মেঘের পাতলা আস্তরনের দরুন, ডিউটি থেকে তাদের আজ আগেই ছুটি দেওয়া হয়েছে।

নাকি তার এক মেয়ে পুজোয় ঘরে ফিরবে না বলে আসলে এবার শরতেরই মন খারাপ?

কি জানি.....

যাইহোক, সেদিনের বিষয়বস্তু ছিল গল্প এবং অনুভূতি নিয়ে। স্মৃতিশক্তি একটু বেশিই ভাল হওয়ার দরুন সেদিন ঠিক কিসের গল্প বা অনুভূতি নিয়ে এই ব্লগ শুরু করেছিলাম, আজ তা একদমই মনে নেই। তাই এই নির্রথক হ্যাজানো।

তবে ট্রেনে, বাসে, আর মেট্রোয়ে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করার ফলে বিভিন্ন মানুষের জীবনযাত্রার গল্পের সাথে পরিচয় ঘটায়, এই ছয় মাসে 'অনুভূতি' শব্দটাকে আরও গভীরে জানার সুযোগ হয়েছে বটে।

কোনোদিন ট্রেনে উঠে শুনতে পাই একদল হাইস্কুল পড়ুয়ার পরীক্ষাশেষের হুল্লোড়, কোনোদিন বা আবার দেখি এক ক্লাস এইটের মেয়েকে জানালার ধারে চুপচাপ বসে চোখের জল ফেলতে। মাঝে মাঝে মনে হয় এরম কাউকে গিয়ে সান্ত্বনা দেওয়া উচিত, তারপরেই আবার মনে পড়ে; আমাদের তো কেউ দেওয়ার ছিলনা, নিজেরাই সব বাঁধা পেড়িয়ে এসেছি... ওই মেয়েটাও পেড়ে যাবে তা নিশ্চয়ই।

জানি, সম্ভবত আমি ভুল ভাবি... একদিন হয়তো এরম কাউকে সান্ত্বনা দেওয়াটাও শিখে যাব। কি জানি, কিছু না বলার থেকে হয়তো কিছু বললে তার উপকার হবে; যেগুলো আমাদের বেলায় হয়নি।


কেউ মেট্রোর সিটে পেয়ে যায় তার জীবনের প্রেম তো কেউ সেই একই সিটে হয়তো ঘন্টাখানেক আগে, হারিয়ে ফেলেছে বহুদিনের পুরোনো প্রিয় এক মানুষকে। কারওর চাকরির চিঠি আসে ভীড়ে ঠাসা ট্রেন কম্পার্টমেন্টে তো তারই পাশে বসে থাকা কারোও অনেকদিন ধরে না হওয়া বিয়ের কথা পাকা হয়ে যায় আচমকা। বাসে কন্ডাকটরের থেকে ভাড়া বাবদ ফিরতি টাকাটা গুনতে গুনতে হয়তো ফোন আসে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুজন সমবয়সী ভদ্রলোকের... কারোর হয়তো প্রিয়জন দূর্ঘটনায় আক্রান্ত, তো অপরজনের পরিবারে এসেছে নতুন অতিথি.....।

আমাদের চারপাশটা সবার জন্য হুবহু এক হয়েও, সবার জন্য কতটা আলাদা, তাই না?

এরমই হাজারো ঘটনা, বলা ভাল গল্প এবং সেই গল্পের অনুভূতিদের সাক্ষী আমি প্রত্যেকদিন হই। নিজের এই একঘেয়েমিতে ভরা জীবনে এগুলো একমুঠো মুক্ত বাতাসের মত কাজ করে। প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধের লড়াই; তার চড়াই, উৎরাইয়ের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে যখন নিজের বেঁচে থাকার আনন্দটাই ভুলে যেতে বসি, তখন এই অচেনা মানুষজন গুলো অজান্তে মনে করিয়ে দেয়... জীবনটা শুধু ইদুরদৌড় নয়। কাল কি হবে, তা ভেবে আজকের দিনটা, আজকের সময় নষ্ট করে লাভ নেই। যতটুকু সম্ভব, আনন্দ কুড়িয়ে নিতে হবে। নিজেদের ভাল থাকার জন্য।

জীবন আস্তে আস্তে এরমই ছোট্টবেলা থেকে শুনে আসা কথা গুলোর মানে বুঝতেও শিখিয়ে দিয়েছে।

আর? গত ছয় মাসে, সব কিছু, সব অনুভূতি, সব শুধু বদলেই গেছে?

নাঃ।

কিছু জিনিসের, কিছু বিশেষ অনুভূতির, বিশেষ মানুষের পরিবর্তন কোনোদিনই হয় না।

ছয় মাসেও না;
আর ছয় বছরেও নয়।

রাত বাড়ছে, এবার উঠতে হবে। ঘুমানোর আগে একবার ভাবছি ছাদটা থেকে ঘুরেই আসব।

এইসব বিশেষ অনুভূতির গল্প তো আবার সেই বিশালাকার আকাশ ছাড়া কেউ আর বোঝে না নাঃ......।।



( এই ব্লগে কল্পনা এবং বাস্তব, দুই-ই আছে। কাজেই, আর মেলাতে যাবেন না, সব গুলিয়ে গিয়ে ছাদে হাওয়া খেতে যেতে হতে পারে রাত্রিবেলায় 😃 )

No comments:

Post a Comment

I Owe You A December

For those, Who still silently cries alone in the bed, when all the switches go off– May you find your light soon, and for foreve...