Saturday, 18 November 2023

শেষের কবিতায় বদলার সুর

সময় প্রায় রাত দুটো। হিমেল আকাশে আজ তারার মেলা। প্রতিদিনই একবার রাতে ছাদ থেকে ঘুরে আসি ঘুমানোর আগে, এতো তারা অনেকদিন পরে দেখলাম। 

কোনো ছোট্ট বাচ্চার এই আকাশ দেখে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে এত তারা আজ একসাথে কেন? "ওরাও কি ভারতের বিশ্বজয় দেখবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে"- এমন ভাবনাও আসতেই তো পারে।

যদি সেই ছেলে বা মেয়েটা একটু ক্রিকেটপ্রেমী হয় এবং তার ছোটবেলায়ে দাদু-ঠাকুমার কাছে গল্প শুনে থাকে, তার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে... ওই নক্ষত্রদের মাঝে কোথাও কি বিরাট, শামি, সিরাজ- তাদের বাবারাও আছে? তারাও নিশ্চয়ই অপেক্ষায় আছে তাদের দেশের বিশ্বজয়ের, তাদের সন্তানদের বিশ্বজয়ের।

কলকাতা থেকে ৪০ কিলোমিটার দুরে যেই শহরতলি থেকে বসে এই লেখাটা লিখছি, তার সাথে আহমেদাবাদের মিল বড় অল্প। ভাষা, পোশাক, সংস্কৃতি, সব আলাদা।
নাকি ভুল বললাম?
আজ তো ভারতের কোনো শহর, গ্রাম থেকে কাউকে আলাদা করা যাবেনা। সমগ্র ভারত আজ মন্দিরে, মসজিদে, চার্চে, গুরুদ্বারে একটাই তো প্রার্থনা করবে... বিশ্বজয়ের।

আর ঠিক এখানেই জিতে যায় ক্রিকেট।

যা রাজনীতি পারেনা, লাইনের পর লাইন নেতাদের, ধর্মগুরুদের ভাষন পারেনা, তা পেরে দেখিয়ে যায় ক্রিকেট। সমস্ত ধর্ম, থেকে মানুষ, সবাইকে এক করে দিয়ে যায়।

২মাস ধরে চলা এই উৎসবের শেষ পাতায় শেষ কবিতাটা আজ লেখা হবে। অনেক নতুন লেখা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের। ম্যাক্সওয়েলের মহাকাব‍্য থেকে কোহলির কীর্তি, ম্যাথেউসের টাইম্ড আউট থেকে আফগানদের স্বপ্নউড়ান বা এক বিদেশি অধিনায়ক, কেন উইলিয়ামসনের জন্য ভারতীয়দের চোখের জল ফেলা।

আর এখানেই জিতে যায় ক্রিকেট ।

লেখকের প্রথম ক্রিকেটিয় স্মৃতি বলতে চলে আসে ২০১১-র ফাইনাল। বিকেলবেলার আঁকার ক্লাস থেকে ফেরার পথে স্যার সবার গালে তিরঙ্গায়ে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন। এবং বাড়ি ফিরে কিছুক্ষণের সকলে মিলে একসাথে বসে খেলা দেখা। কিছুক্ষণের মধ্যেই হঠাৎ উৎসবের আমেজ। বাড়ির বড়রাও পাগলের মতন আনন্দ করছে, হাসছে; পাড়ায় বাজি ফাটছে, সকলে মিলে রাস্তায় বেরিয়ে যাওয়া। এবং অবশ্যই কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে আমাকে নিয়ে কোলে করে মাতামাতি করা। খেলার কিছুই বুঝতাম না তখন। তবে এটা বুঝেছিলাম যে এই খেলাটা কোনোভাবে সকলকে হাসাতে পারে, আনন্দ দিতে পারে।

২০১৯। ক্রিকেটটা মোটামুটি বুঝি। সেই বিশ্বকাপে এটা বুঝলাম যে ক্রিকেট হাসাতে যেমন পারে, কাঁদাতেও পারে। আনন্দ যেমন দিতে পারে, মনও ভাঙচুর করতে পারে। কোথাও তার প্রভাব যেন ভেঙে যাওয়া প্রথম প্রেমের মতো। চেষ্টা করেও ভোলা যায় না। যন্ত্রণা মনে গেঁথে থাকে।

তবে ক্রিকেটই বোধহয় আবার দ্বিতীয় সুযোগ দেয়।

২০০৩-এর বিশ্বকাপ ফাইনালের সময় আমার জন্ম হয়নি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে পরিমান প্রতিশোধের স্পৃহা দেখছি, তাতে কোথাও যেন সেইদিনের ফাইনালের রয়ে যাওয়া ক্ষতটা অনুভব করা যায়। 
আজ ফের সুযোগ এসেছে। ক্রিকেট দেবতা মুখ তুলে চেয়েছেন। ২০ বছর আগের রাতের বদলা নেওয়ার সুযোগ আজ। ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া। ফের ফাইনালে মুখোমুখি।

ক্রিকেট সুযোগ দেয়। প্রত্যাবর্তনের বা প্রতিশোধের সুযোগ দেয়।

জীবনও তাই-ই বোধহয়। 

আজ ২০০৩ এর ক্ষত শুকিয়ে যাক।
হেরে যাওয়া প্রেমিকদের চোখের জল আজ মুছে যাক।

শেষের কবিতায় আজ লেখা থাকুক না বিশ্বজয়ের মহাকাব্য।

নতুনের ফাইনালে আজ পুরোনোর বদলা হোক না!

নিল রঙে রাঙিয়ে যাক শেষ পাতাটা।
রাঙিয়ে যাক গোটা ভারতবর্ষ।

Friday, 3 November 2023

স্বপ্ন বেচা, স্বপ্নপূরণ আর ক্রিকেট!

'মহীনের ঘোড়াগুলির' অন্যতম জনপ্রিয় গান "পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে"-র একটা লাইন এই ক্রিকেট বিশ্বকাপ দেখার সময় বার বার কানে বাজছে। অমর একটা লাইন, - "স্বপ্ন বেচার চোরা কারবার, জায়গাতো নেই তোমার আমার..."

দেখুন মহীনের ঘোড়াগুলির গানের সমালোচনা করার ইচ্ছা বা ধৃষ্টতা, কোনটাই আমার নেই। তবু বলতে ইচ্ছা হয় যে কোথাও যদি স্বর্গীয় শ্রী তাপস দাস এবং স্বর্গীয় শ্রী রঞ্জন ঘোষাল (ব্যান্ডের দুই গীতিকার) স্বপ্ন পূরণের কথাটাও লিখে যেতেন...।

ক্রিকেটের সাথে তো আবার স্বপ্নপূরণ আর স্বপ্নভঙ্গ, দুটোই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। তাই না?

ঠিক বছর চারেক আগে ম্যানচেস্টারে ভারতীয় দল নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে হারার পর ত‍ৎকালিন সহ অধিনায়ক রোহিত শর্মার কান্নার দৃশ্য ভাইরাল হয়েছিল। আপামর ভারতবাসি কেঁদেছিল। বিরাট কোহলি কেঁদেছিলেন কিনা ক্যামেরা ধরতে পারেনি। তবে বিধ্বস্ত সেই মুখটার ছবি অনেকেরই মনে গেথে আছে।

সেই একই বিশ্বকাপ। ফাইনালে অদ্ভূত নিয়মের জেড়ে হেরে যায় নিউজিল্যান্ড। নিউজিল্যান্ডের সমস্ত ক্রিকেটাররা হতাশ। কাঁদছেন। অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের মুখে তখনও হাসি লেগে। সেদিনই বিশ্ববাসী শিখে নিল জীবনযুদ্ধে চলার পথে একটি দর্শন - চরম হতাশাতেও মুখের হাসিটা যাতে না মোছে...।

বিগত ২০-২৫ বছরে যতজন ভারতে ক্রিকেট ব্যাট হাতে তুলে নিয়েছে বা ক্রিকেট শিখতে গিয়েছেন কোনো ক্যাম্পে তাদের শতকরা নিরানব্বই ভাগের আইডল হয় সচিন তেন্ডুলকর নচেয় বিরাট কোহলি। বিরাট কোহলির আইডল কে সেটাও সবার জানা... স্বয়ং সচিন-ই। 

আর পাঁচজন ভারতীয় কিশোরের মতন বিরাটেরও স্বপ্ন ছিল দেশের জার্সি গায়ে চাপানোর। দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার। তিনি গর্বের সাথে তা করে চলেছেন। এবং শুধু তাই নয়, তার আইডলের ওডিআই ক্রিকেটের অবিশ্বাস্য এক রেকর্ড, ৪৯ সেঞ্চুরির থেকে মাত্র একটি সেঞ্চুরি দুরে। সারা ভারত অপেক্ষায় আছে সেই ঐতিহাসিক মুহুর্তের, যখন তিনি ছুঁয়ে ফেলবেন ক্রিকেট ইশ্বরের সেই কীর্তিকে।

আচ্ছা, ম্যাঞ্চেস্টারের সেই রাতে বিরাট নিজেও কি কখনও এই আসন্ন মুহুর্তের কথা ভাবতে পারতেন?

২০১১ সালে বিশ্বকাপজয়ী দলে ডাক না পাওয়া রোহিত শর্মা ভেবেছিলেন কোনোদিন যে তিনিই ভারতীয় দলের অধিনায়ক হয়ে বিশ্বকাপের দৌড়ে নেতৃত্ব দেবেন?

ভারতের বাইরে যাওয়া যাক। কয়েক বছর আগের কথা। আফগানিস্তানের দখল নিল তালিবানরা। সে দেশের মহিলাদের খেলাধুলো সম্পূর্ণ বন্ধ। প্রশ্নের মুখে পুরুষ দলের ক্রিকেট ভবিষ্যতও। কোনোভাবে নিজেদের দেশ ছেড়ে বিদেশ অনুশীলন চালিয়ে রাখলেন তারা। 

২৩-এর বিশ্বকাপে তারাই তৈরী করছে একের পর এক রূপকথা। রশিদ খান-দের দেখে সে দেশে এখন বোমাগুলিনর শব্দের মাঝে শোনা যায় ব্যাট-বলের আওয়াজও।

ডাচেরাও কি কম স্বপ্ন বুনেছে এই টুর্নামেন্টে? হারিয়েছে প্রবল পরাক্রমশালী দক্ষিণ আফ্রিকাকে, বাংলাদেশকেও। রূপকথার থেকে এগুলোও বা কম কি?

১৯-এর পরাজিত নেতা উইলিয়ামসনও তো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন।


ক্রিকেট চিরকাল স্বপ্ন দেখায়। কখনও তা পূর্ণতা পায়। কখনও চিরতরের জন্য ভেঙে যায় সেই স্বপ্ন। আর বিশ্বকাপগুলো সেই স্বপ্নের বারুদের মতন আসে। ১৯৮৭-র বিশ্বকাপ যেমন স্বপ্ন দেখিয়েছিল মুম্বাইকর এক কিশোরকে। যিনি সেই টুর্নামেন্টে বলবয় ছিলেন। সুনীল গাভস্কর তাকে ডেকেছিলেন ড্রেসিংরুম দেখানোর জন্য। পরবর্তীতে সেই কিশোরকে সারা দুনিয়া ক্রিকেটের ভগবানজ্ঞানে পুজো করলেও, সে বিশ্বকাপের স্বাদ পেয়েছিল নিজের কেরিয়ারের একদম শেষে, ২০১১-এ। 
বুঝতেই পারছেন সচিন তেন্ডুলকারের কথা বলছি। স্বয়ং তার স্বপ্নপূরণ হতে লেগেছিল ২৪ বছর।

এই বিশ্বকাপও নিশ্চয়ই অনেক এমন স্বপ্নের জন্ম দেবে। নিশ্চয়ই ভবিষ্যতের কোনো সচিন বা কোহলির মনে গেথে দেবে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। নিশ্চয়ই তারা ভেঙে দেবে এমন অনেক রেকর্ড যা আজও অভাবনীয়।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল, কদিন আগে এক পরিচিতের সাথে কথা হচ্ছিল যে কিভাবে সদ্য কৈশোরে পা রাখা তার ভাইয়ের সমস্ত ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠেছে ক্রিকেট। শুনে আনমনেই হাসলাম। 
এবং বললাম যে "দেখিস, স্বপ্নটা যাতে বিক্রি না হয়ে যায় আর দশটা ছেলের মতন। ক্রিকেটটা যাতে খেলতে পারে..."

বছরের পর বছর এরম কত স্বপ্ন ভাঙে,
তবে আবার তৈরিও হয়, মজবুত ভাবে...
হাতে গরম প্রমান আরও একবার পেলাম।

শুরুটা করেছিলাম যখন মহীনের ঘোড়াগুলি গানের লাইন দিয়ে, সেই একই গানের লাইন দিয়ে শেষ করি...

"তার চেয়ে এসো খোলা জানালায়
পথ ভুল করে কোন রাস্তায়
হয়তো পেলেও পেতে পারি আরো সঙ্গী..."

মাফ করবেন, আশাবাদী হওয়ার কথাওতো তারাই বলে গেছেন। কাজেই আরও বেশ'কটা ছেলেমেয়ে স্বপ্ন দেখুক না...

ক্ষতি কি?

I Owe You A December

For those, Who still silently cries alone in the bed, when all the switches go off– May you find your light soon, and for foreve...