Sunday, 21 September 2025

শিউলিতলার DDLJ

                                         Love is not a climax,
                                        but a series of paused moments
                                        that choose us over & over!






তাদেরকে,
যারা ভালোবাসতে চেয়েও,
আজ ভালোবাসাকে ভয় পায়...

সকল ব্যর্থ এবং ভীতু প্রেমিক/প্রেমিকাদের জন্য








ইনস্টাগ্রামের ফিল্টার মাখা ভালোবাসার যুগে, রাজ-সিমরণের DDLJ-র গল্প আজকাল আর কোথায় পাওয়া যায়! ব্যস্ততার শহরে, প্রেম ভালোবাসা তো অনলাইন শপিং-এ জিনিস কেনার মতো হয়ে গেছে, ইচ্ছে মতো কেন, আর না পোষালে সময়ের মধ্যে রিটার্ন বা এক্সচেঞ্জ। কিন্তু ওই যে... পৃথিবীতে যুগে যুগে কিছু মহান মানুষ জন্ম নিয়েছে, যারা গতে বাঁধা জীবনে ধরা দেবে না বলে ধনুক ভাঙ্গা পণ করে বসে থাকে। আর এদের নিয়েই আজও, আমার মতো লোকেরা গল্প বোনে।

আমাদের এই DDLJ গল্পের নায়ক ব্যারাকপুরের রাজ। পুরো নাম রাজর্ষি গাঙ্গুলি হলেও... ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির দু হাত ছড়িয়ে কাপানো গলায়, "নাম তো সুনা হি হোগা" বলা ভদ্রলোকের দৌলতে, ওর রাজর্ষি নামটা জন্ম থেকেই রাজ হয়ে গেছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, এই লোকটাকে একেবারে সহ্য করতে পারে না রাজ। কি অদ্ভুত সব সিনেমা বানিয়ে রেখেছে! গাঁজাখুরি প্রেমের গল্প পেয়েছে আর সিনেমা বানিয়ে নিয়েছে! আরেঃ বাবা, জীবন থোড়াই এতো সোজা। আর জীবন সোজা হলেও– প্রেম সোজা জিনিস? যাতা কিছু একটা বানালেই হলো না?! রাজ নিজের মনে এসব ভাবে, আর তিরষ্কার করতে থাকে পৃথিবীর সমস্ত প্রেমের গল্প, কবিতা, সিনেমা বানানো আর্টিস্টদের।
আগে যদিও এরকম ছিল না রাজ। "ভালোবাসা" শব্দটির প্রতি তার মনে একটা ভীষণ গদগদ ভক্তি, বিশ্বাস আর শ্রদ্ধা ছিল। কিন্তু, ওই একটা ঘটনার পর থেকে...

বুঝতেই পারছেন, ঠিক একদম সিনেমার মতো... আমরাও এবার ফ্ল্যাশব্যাক সিনে চলে যাচ্ছি ইতিহাস জানতে। চলুন, তাহলে যাওয়া যাক। তবে বেশি আবার কেউ আবেগপ্রবণ হয়ে যাবেন না। নিজের হার্টের বেল্টটাকে শক্ত করে বেঁধে নিন। শুধু সিনেমা না, চিরকাল এই পৃথিবীও সাক্ষী। ইতিহাস ব্যাপারটা কিন্তু হালকা চাপের বিষয়!

ব্যাপারটা তেমন কিছু নয় যদিও। মানে ওই ইলেভেন-টুয়েলভের ক্লাসগুলোতে যা হয়ে থাকে আর কি। হঠাৎ করে একজনকে খুব ভালো লেগে যায়। রাজেরও একজনকে ভালো লেগেছিল, ভীষণ ভালো। পড়াশোনা আর ক্রিকেটে বরাবর ভালো রাজের স্কুলে ক্লাস ইলেভেনে ওঠার পর, এসেছিল এক নতুন ছাত্রী। বছর দেড়েক ধরে লুকিয়ে বেনামে চিঠি লেখা, facebook-এ স্টক করার পর শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয় মেয়েটিকে তার মনের কথা জানানোর। আর অল্প বয়সে যেটা ভাবা যায় না, ঠিক সেই অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্সই ঘটে যায়। প্রত্যাখ্যাত হয় রাজ। জীবনের প্রথম ভালোবাসা, যাকে অনেক স্বপ্ন নিয়ে যত্ন করে বুনেছিলো। আর কি? এই ঘটনার পরে, বুকে ব্যথা নিয়ে (অন্য ব্যথা) আমাদের রাজবাবু শপথ নিলেন– ওই সব প্রেম ভালোবাসার রাস্তায়, আর ভুল করেও গাড়ি ঢোকানো যাবে না!

কিন্তু ওই যে, অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স বললাম না? জানেন, আমাদের জীবনের সব থেকে বড়ো সত্যি হচ্ছে এই অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স। যা ভাবি, একদম ঠিক তার আলাদা কিছু ঘটে যাবে। যাবেই। কি মায়ায়ে, কার আশীর্বাদে, কে জানে?!




আগরপাড়ার মেয়ে সিমরণ সেন। পড়াশোনায় বরাবরের স্কুল টপার হয়েও, ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যালের চেনা রাস্তা ছেড়ে সে বেছে নিয়েছে ইংরেজি সাহিত্য। এইটুকু পড়ে পাঠকের মনে হতেই পারে যে আমাদের নায়িকা হয়তো একদম ওই রূপকথার মতো সব প্রেম কাহিনীতে বেশ বিশ্বাসী। তাই ইংলিশ অনার্স; তা কিন্তু আদপেই না। প্রেম ভালোবাসার থেকে সেও বেশ কয়েকটা হাত দূরেই থাকে। নিজের ইচ্ছায়। স্কুল লাইফে তার কাছে প্রায়ই সিনিয়র, জুনিয়র এবং সমবয়সী, প্রায় সব লেভেল থেকেই প্রস্তাব ও প্রোপোসাল আসলেও, কাউকেই সিমরণ পাত্তা দেয়নি। চিরকাল নিজের বইয়ের জগৎ নিয়েই সে মেতে ছিল, এখনো তাই। তবে, বলিউডের লাভ স্টোরির অন্ধভক্ত সিমরণ, শেক্সপিয়ারের নাটকে বিশ্বাসী না হলেও, একটা ফিল্মি স্টাইল আদর্শ রমকম স্ক্রিপ্টের পার্ট হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা , তার মনের ভিতরে বাসা বেঁধে আছে বহুদিন। সে কেবল প্রকাশ করতে চায় না।

আর কি জানেন পাঠক ভাই, বা বোন? আমার মতো এই উটকো ('ছ্যাচড়া' শব্দটা ব্যবহার করতে গিয়ে ভাবলাম–না! শব্দচয়নে সংযমী থাকা উচিত) লেখকরা না, আবার এসব অপ্রকাশিত ব্যাপার- স্যাপার নিয়ে নাক গলিয়ে হেব্বি আনন্দ পায় ! আমি থোড়াই ব্যতিক্রমী হবো... হুহ্! 




দমদম স্টেশনের সাবওয়ে থেকে বেরিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে দাঁড়িয়ে, একটু শ্বাস নিল সিমরণ। সেকেন্ড সেমেস্টারের প্রথম দিনটাই হেবি দেরি হয়ে গেল। দোষ যদিও ওর নয়– ২০ মিনিট দেরিতে পৌঁছানো নৈহাটি লোকালের। সিমরণ খেয়াল করেছে, আজ অবধি কোনোদিন এই ট্রেনটা ঠিক সময়ে আসেনি। বাঙালিয়ানার অদ্ভুত নিদর্শন বটে!

সিমরণের কলেজ মধ্য কলকাতা আর দক্ষিণ কলকাতার সংযোগস্থল পার্ক স্ট্রিটে। প্রথম সেমেস্টারে কলেজের নিয়মে ১১টার মধ্যে পৌঁছাতে হতো। সময়ের সাথে ২য় সেমিস্টারের প্রথম দিনের ক্লাস এক ঘণ্টা পিছিয়ে ১২টায় রেখেছে।

তবে এখন অলরেডি ১১টা ২০ বেজে গেছে, এবং সিমরণ এখনও মেট্রো স্টেশনে ঢুকতেও পারেনি। আজ মনে হচ্ছে কপালে দুঃখ আছে। প্রথম ক্লাস তাদের HoD BR ম্যাডামের, যার কাছে ট্রেন লেট করা, মেট্রো দেরিতে আসা, বাস না পাওয়া, এসব শুধুই "ফাঁকিবাজির উপায়, আদপে এসব নাকি মিথ্যা। ট্রেন, বাস, মেট্রো সব ঠিকঠাক চলে।"

সিমরণ মাঝে মাঝে ভাবে, ম্যাডামকে পরিবহণ দপ্তর এবং রেল দপ্তরের থেকে যৌথভাবে পুরষ্কৃত করা উচিৎ। পারলে অ্যাম্বাসাডর্ বানিয়ে দিক। এত প্রশংসা মন্ত্রীরাও নিজেদের দপ্তরের ব্যাপারে করে কি না সন্দেহ!

ব্যাগ চেক করিয়ে টিকিট স্ক্যান করার যন্ত্রের সামনে এগোতেই সিমরণ দেখলো একটা ছোটোখাটো লাইন হয়ে গেছে। মানে, আরো কিছুটা সময় নষ্ট হবে এখানে।

ভিড় নিজের গতিতে এগোতে থাকে। টিকিট স্ক্যানিং মেশিনের সামনে এখন আর দুজন, তারপরেই সিমরণ। সমস্যাটা বাঁধল, প্রথমজন চলে যাওয়ার পরে।

সিমরণের সামনে ওর-ই বয়সী একটা ছেলে, সম্ভবত কলেজ পড়ুয়াই হবে। ছেলেটা যতোবার কার্ড সোয়াইপ করাচ্ছে, ততবার রিজেক্ট হচ্ছে। গেটটা কিছুতেই খুলছে না। মনে মনে অধৈর্য্য হয়ে যায় সিমরণ। আগ বাড়িয়ে কিছু বলা বা ধৈর্য্য হারানো তার স্বভাবে নেই। এদিকে ওর পিছনেও কোনো লোক নেই, যে তারা ছেলেটাকে তাড়া দেবে। আর পাশের মেশিনটার গায়ে এখন যান্ত্রিক গলযোগের কারণে "Not Working"-এর বোর্ড ঝুলিয়ে গেছে কর্ত্তৃপক্ষ। সারানোর কোনো বালাই নেই।

ওদের HoD এই বিষয়টাকে কি করে justify করতো মেট্রোর মুখপাত্র হলে, এটা ভেবে রাগের মাথাতেও মনে মনে হেসে ফেলল সিমরণ। হায় রে!

তবে নাঃ! দুই মিনিটের বেশি হতে চললো ছেলেটা  অঙ্ক করার মতো ট্রায়াল অ্যান্ড এরোর করেই চলেছে। এবার কিছু না বললে সিমরণ আজ আর কলেজ দূর, মেট্রো ট্রেনটাকেও দর্শন দিতে পারবে না।

"আরে ভাই-দাদা! সারাদিন কাটিয়ে দেবেন নাকি এখানেই? হলে এগোন, নইলে বাকিদের এগোতে দিন। আজব অসভ্যতামি তোঃ!" রাগত কণ্ঠে বলে ওঠে সিমরণ।

এতোক্ষণ ধরে কার্ড সমস্যায় নাজেহাল ঘাবড়ে থাকা পাঁচ ফুট-আটের ছেলেটা এবার হঠাৎ পেছন ঘুরে সানগ্লাসটা খুলে চুলের উপরে স্ট্যান্ড করালো। সিমরণের দিকে তাকিয়ে, খুব ঠান্ডা গলায় বলে উঠলো,

"আর এই যে অচেনা একটা ছেলেকে দেখে প্রথমে ভাই, তারপর দাদা বলে সম্বোধন করলেন, এটা কি খুব সভ্যতা জ্ঞানের পরিচয়?"

সিমরণ 'হা' হয়ে যায়। এরকম একটা উত্তর যে আসতে পারে, কষ্মিনকালেও কল্পনা করেনি সে। অন্তত দশ সেকেন্ড তার না পড়া চোখের পাতা, আর ব্ল্যাক হোলের মতো বিস্ময় নিয়ে খুলে থাকা মুখ; একসাথে কলকাতার বিশুদ্ধ দূষিত বাতাস গ্রহণ করেছিল সেদিন।

(হেব্বি বলেছে নাঃ, রাজ এই লাইনটা?)




নেড়া বেলতলায় প্রাচীন প্রবাদ অনুযায়ী একবার যায়। তবে কিছু মানুষ দ্বিতীয়বারও যায়, যদি প্রথমবারে তারা বেলের দর্শন না পায়। আর সেসব দর্শন নিয়েই, হয়ে যায় আস্ত একেকটা গল্প। যেমন? এই যে- এটা।

সিমরণের কলেজের ক্লাসের কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। আজ বারোটায় ডাকে, তো কাল এগারোটা কিংবা একটা। গত কদিন, সব ঠিকঠাক চললেও, আজ আবার বারোটায় ক্লাস ফেলেছে। এবার থেকে মঙ্গলবার করে ফার্স্ট ক্লাস বারোটাতেই থাকবে। আর গত মঙ্গলবারের মতো নৈহাটি লোকাল আজও লেট, আর আবারও সিমরণ দমদম স্টেশনে মেট্রো ধরার জন্য জীবন বাজি রেখে দৌড়াচ্ছে। অলরেডি দুই কাকিমা ওর সেই দৌড়ে আতঙ্কিত হয়ে একটু জোরে কমেন্টরি করতে গিয়ে গোটা জেনারেশনটার মৃত্যুপূর্বক শ্রাদ্ধকর্ম দায়িত্বের সাথে পালন করেছেন। অবশ্যই, সেসব মন্ত্র কানে নেওয়ার মতো সময় বা বাসনা, কোনোটাই আমাদের নায়িকার ছিল না। সে প্রাণপণে চেষ্টায় ব্রতী কোনোভাবে যদি এই মেট্রোটা ধরা যায়। ওই তো এসে গেছে প্লাটফর্মে, ট্রেনটা দাড়িয়েই আছে- এই যাঃ! ট্রেনের দরজা বন্ধ...

হতাশ হয়ে নিজের কপালকে যেই না দোষ দিতে যাবে সিমরণ, সে দেখে দরজাটা পুরো বন্ধ না হয়েই আবার খুলে গেল... কেউ দরজা বন্ধ হওয়াটা, আটকে দিয়েছে। এক দৌড়ে ছুটে সিমরণ গিয়ে মেট্রোয় প্রবেশ করল। দু'সেকন্ড শ্বাস নেওয়ার পর তার খেয়াল হলো তাকে, যে মেট্রোর দরজা বন্ধ হওয়াটা আটকেছিল। 

একদম! ফুল মার্ক্স পেয়েছেন, পাঠক। সেই ছেলেটা যার সাথে সিমরণের গত পরশু মেট্রো স্টেশনে ছোট্ট একটা ঝগড়া হয়েছিল।

আমাদের গল্পের নায়ক, রাজ। নায়িকা এখনও অব্দি নাম না জানলেও, আমরা তো জানি।

"Thank You", অপ্রস্তুত হাসি নিয়ে আলতো স্বরে রাজকে ধন্যবাদ জানালো সিমরণ।

কান থেকে হেডফোনটা খুলে সিমরণের দিকে তাকাল রাজ। ঘাড় নেড়ে হাসল রাজ।
"তাহলে, অসভ্যতামি বাদে ভালো কাজও, কিছু করতে পারি, তাই তো?"
(এটা সিনেমা হলে জানেন পাঠক, সারা হলে এই ডাইলগটায় হুইসল পড়তো।)

যথারীতি, এবারও কোনো উত্তর ছিল না আমাদের নায়িকার কাছে।




ব্যাপারটা একটু 'কেমন কেমন' লাগছে রাজের। আজ আবার একটা মঙ্গলবার। আবার একটা দমদম মেট্রো, কলেজ যাত্রা, আর আবার একটা, ওই 'কেমন কেমন' ঘটনা। এই নিয়ে পরপর তিন সপ্তাহ মেয়েটার সাথে দেখা। সবটাই কাকতালীয়? কিন্তু গোটা ব্যাপারটা কেমন একটা বলিউড সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো লাগছে যে এখন। কেন?

কারণ, মেয়েটা, মানে সিমরণ, এই মুহূর্তে বসে আছে রাজের সামনের সিটটায়, আর একটা বই পড়ছে। আড়চোখে, একবার বইটা দেখ নিল রাজ। মৈত্রেয়ী দেবীর "ন হন্যতে"। ও জানে মেয়েটি ময়দান স্টেশনে নামবে। গত সপ্তাহের মতো গেলে, আর কি! এখন সবে বেলগাছিয়া, মেট্রোটাও ফাঁকাই আছে প্রায়। একবার কথা বলে দেখবে নাকি, সে? আজ কারণ, ও সুযোগ দুই-ই আছে।

"কথা বলা যায়?"
"হ্যাঁ? কি?" অপ্রত্যাশিত এই প্রশ্নে সিমরণ চমকে ওঠে।
"না মানে, এমনিও তো বইটা পড়ছেন না। মেট্রোয় ওঠা ইস্তক আমায় মাপছেন। তাই হয়তো খেয়াল করেননি উত্তেজনার বশে, তবে, আপনি বইটা উল্টো করে পড়ছেন।" হাসতে হাসতে বলে রাজ।

অজান্তেই হাতটা দিয়ে কপাল ঢেকে নিল সিমরণ। ওর ইচ্ছা হচ্ছে চলন্ত মেট্রোর বন্ধ দরজা ভেঙ্গে ফেলে লাফ দিতে লাইনে। তবে, রাজ তার অস্বস্তি খেয়াল করতে ভুলল না।

"আরে প্লীজ্! Embarrassed feel করবেন না। প্রত্যেক মঙ্গলবার যেরকম কাকতালীয় সব ঘটনা ঘটছে, তাতে এটা খুবই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বলে আমি মনে করি।

"Exactly তাই! Please খারাপ কিছু মনে করবেন না। মানে, ঘটনাগুলো এমন ভাবে ঘটছে প্রতি সপ্তাহে, তাই মানে..." সিমরণ মুখে অবশেষে কথা ফুটল।

"একদমই। আমিও বেশ অবাকই হচ্ছি। হাই! আমি রাজর্ষি গাঙ্গুলী, ছোট করে রাজ। ID card গলায় দেখে বলতে পারি, same university, same semester।" করমর্দন করার জন্য হাতটা এগিয়ে দিল রাজ।

"আমি সিমরণ সেন। University আর semester তো জানা হয়েই গেছে-"

"হ্যাঁ। ব্রাঞ্চটা বলা হয়নি, আমার mathematics।"

"বাঃ! আমার ইংলিশ। তা এই, মেট্রোর অঙ্কটা এরকম গোলমেলে হয়ে গেল কেন?"

"অঙ্ক গোলেমেলে হয় না ম্যাডাম! ভুলটা হয় ক্যালকুলেশনে-

"যাঃ। ময়দান এসে গেছে। বেরোতে হবে। তবে, সিলেবাসে থাকলে, অঙ্ক কিন্তু মিলবেই। বাই!"

রাজের উত্তরের অপেক্ষায় না থেকেই, মেট্রোর দরজা বন্ধ হয়ে যায়.....




আজ ফের একটা মঙ্গলবার। ভাদ্র শেষের আকাশ জানান দিচ্ছে, দিন গোনার পালা শেষ। বাঙালির শ্রেষ্ঠতম উৎসব, দুর্গাপুজো প্রায় এসে গেছে। রাজ বা সিমরণ– দমদম স্টেশনে ঢুকতে ঢুকতে যদিও তাদের কারোর মাথায়ই চিন্তা পাড়ার প্যান্ডেলে বাঁশ লাগানো নিয়ে নয়। একটাই ভাবনা মনে, আজও কি দেখা হবে একে অপরের সাথে?

কেন এই ভাবনা? ধুর্! বোঝেন না যেন কিছু!


প্ল্যাটফর্মে সিঁড়ির মুখে সিমরণকে দেখতে পেল রাজ। ঘড়িতে সময় দেখছিল সে।


"নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে এরকম কাকতালীয় ঘটনা ঘটলে, সেটাকে কি আর accidental meet বলা যায়? সুপ্রভাত"


"সাড়ে এগারোটায় সুপ্রভাত? ভালো কথা। তবে, planned accident কথাটা শুনেছেন কখনো?"


"তার মানে, আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, কি?"


কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসলো সিমরণ। "মেট্রো এসে গেছে কিন্তু"


"আচ্ছা, মেয়েরা সোজা উত্তর দেয় না কেন বলুন তো?"


মেট্রোয় দরজার দুপাশে হেলান দিয়ে দুজনে দাঁড়িয়ে আছে। আজ বেশ ভিড় আছে।


"এতো জানেন মেয়েদের ব্যাপারে, দারুণ ব্যাপার তোঃ। অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ একেবারে মনে হচ্ছে।", শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে কথাগুলো রাজের দিকে ছুড়ে দেয় সিমরণ।


"সব কিছু জানতে অভিজ্ঞতা লাগে না। কিছু জিনিস সাধারণ জ্ঞান হিসেবে ধরা হয়। আর অসাধারণ কারোর সান্নিধ্যে থাকার সৌভাগ্য হলে, ওই সাধারণ জ্ঞানটুকুই অনেকটা কাজ করে দেয়"


"তা আপনার এই সাধারণ জ্ঞান দিয়ে আমাদের সেই না মেলা অঙ্কটার হিসেব মিললো? নাকি তা শুধু ফ্লার্ট করতেই জানে?"


"সুস্থ ফ্লার্ট করাটাও অঙ্কই ম্যাডাম। জীবনের বৃহত্তম সিলেবাসে, ওটা খুব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্ক!"


"আমার ব্যাপারে কিছুই জানেন না- আচ্ছা, এক মিনিট। আমরা কি তুমি করে কথা বলতে পারি? সমবয়সী কারোর সাথে আপনি করে বলাটা-"


"হ্যাঁ, এমনিতেও বিয়ের পরে-"


"কি?!" রাজ উত্তর দেওয়ার অবাক চোখে প্রশ্ন করে সিমরণ।


"না মানে, হ্যাঁ। আনন্দের সাথে।"


"তো যেটা বলছিলাম, অচেনা একজনের সাথে এরকম কথা বলতে, বা ফ্লার্ট করতে, কোনো রকম অনিশ্চয়তা জাগে না?"


"নাম, কলেজ, ব্রাঞ্চ কত কিছুই তো জানি। আসলে অঙ্ক মেলানোর জন্য ইনফর্মেশন তেমন জরুরি নয়। ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যাবসায় লাগে। তুমি বলো আমায় ভরসা করে কথা বললে কি ভাবে? Social Media তে স্টক করে নিশ্চয়?"


"বাদ দাও। পার্ক স্ট্রিট চলে এসেছে। পরের স্টপেজে নামতে হবে। Do you believe in destiny? কি মনে হয়, পরের সপ্তাহে আবার planned accident হবে?"


"চাইলে বাঙালি নোবেল জিতে নেয়, আর এ তো মেট্রো। আলবাত হবে। কন্ট্যাক্ট করতে পারলে-"


"তাহলে তো আর accident থাকে না বিষয়টা"


"বেশ। চ্যালেঞ্জ রইল। বারে বারে এই accident-টাই ঘটাব না হয়।"


"বেশ! অপেক্ষায় থাকব সপ্তাহখানেক। আর destiny-র উত্তরটাও সেদিনই নাহয় শুনব, accident ঘটলে। তবে, মঙ্গলবারই কিন্তু শেষ দেখা আমাদের সম্ভবত। তারপর মহালয়া, পুজোর ছুটি। আর ছুটি শেষে পরীক্ষা। চান্স নেই দেখা হওয়ার আর।"


"Accident ঘটবেই। অঙ্ক পুরো মেলা অব্দি তো ঘটতেই হবে! আর শেষ বল খেলার আগে জানবেন, কোনোদিন ম্যাচ শেষ হয় না, ম্যাডাম।"


সিমরণ চলে যেতেই মেট্রোটা আবার সেই মতো অফিস-টাইমের গোমরা মুখো কাকুর মতো চলতে লাগল। আর অঙ্কের ছাত্র রাজ, ইংরাজি শব্দ "destiny" নিয়ে গবেষণায় মন দিল।


আর শহরে, এ বছর আগে আসা শরৎ মুচকি হেসে আবার মনে করাল, পুজো কিন্তু এসে গেছে। হাতে সময় খুব কম, খুব!





একদম। নির্ভুল অনুমান আপনার পাঠক। আজও মঙ্গলবার এবং... এবং গল্প এগোনোর দিন। পুজোর আগে, মেট্রোর ভিড় কিন্তু ক্রমশ বাড়ছে। আর রাজের রুমাল বলে দিচ্ছে, টেনশনে সে ঘেমে অস্থির। নায়িকা, আসবে তো? সময় তো হয়ে গেছে।


হঠাৎই রাজের কাঁধে আলতো টোকা পড়লো। "শরৎকালে বৃষ্টি হচ্ছে, আর তুমি এমন ঘামছো কেন?"


"সেটা বুঝলে তো কবেই গল্প শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রীদের যে মাথায় শেক্সপিয়র বাদে আজকাল কিছু ঢোকে না, সেটা আমার জানা ছিল না", সিমরণকে দেখে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে উত্তর দেয় রাজ।


"উফফ্ রেডিও জকি হতে পারতে। এতো স্পনটেনিয়াস!"


"বললে সেটাও হয়ে যাব।" হাসতে থাকে রাজ।


"ঠিক আছে। আপাতত, মেট্রো এসে গেছে। চলো। আজই তো শেষ সফর।"


"আগেরদিন ডেস্টিনি-র কথা বলছিলে না? একটু ঘেঁটে বুঝলাম, প্রাচীন গ্রিক মাইথোলজির কনসেপ্ট এটা, যার মানে, এমন কিছু ঘটনা ঘটা, যার উপর আমাদের কোনো হাত থাকে না। আমার কাছে এই মেট্রো সফরটাও কিন্তু একটা ডেস্টিনিরই অঙ্ক। শুরুটা হিসেব মেনে হয়নি যখন, শেষটারও দায়িত্ব মন বলছে, ডেস্টিনিই নেবে।"


"ডেস্টিনি জানি না, তবে কাল মহালয়া। পুজো এসে গেল।"


"হুমম্। তা ভোরবেলায় ওঠা হয়, নাকি ঘুমিয়েই দিন কাবার?"


"এক্সকিউজ্ মি! প্রতি বছর এই রাতটা আগাগোড়া জেগে থাকি। আর কাল তো কলেজে 'আগমনী উৎসব' আছে দশটা থেকে। আমার একটা সোলো ডান্স পারফোরম্যান্সও আছে সেখানে..."


এক নাগাড়ে কথা বলে যেতে থাকে সিমরণ। রাজ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে প্রতিটা শব্দ। কি আছে সেসব বাক্যে? কি এমন জাদুবলে রাজ নিজেকে আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলছে... সমর্পণ করছে এক অনিশ্চিত অজানার কাছে?


আর সিমরণই বা কেন এতো কথা বলছে রাজকে? বলতে বলতে সে নিজেই অবাক হয়ে যায়। আগামীকালের অনুষ্ঠানের কথা, তার জন্য নেওয়া একমাসের প্রস্তুতি, নতুন শাড়ি, তার মায়ের দেওয়া একটি আংটি কালকের জন্য– যা আজ শেষ প্র্যাকটিসের জন্য সে পরে এসেছে, তবে এখনো বেশ লুজ্ হচ্ছে আঙ্গুলে– এই সমস্ত কথা সে বলেছে রাজ কে। সে তো কোনোকালেই এতো এক্সট্রোভার্টেড ছিল না.... এখন কেন সে আপনিই হয়ে যাচ্ছে, তাহলে?


কিন্তু সময় কারোর জন্যই থেমে থাকে না। বিশেষ করে, তা যদি হয় অনুভূতিদের নিয়ে দোলাচল ও দ্বিধাগ্রস্ত মনেদের দন্দ্ব, সে ক্ষেত্রে 'সময়' নামক সেই অশরীরী আরো কঠিন। তার কাঠিন্যতা কে মান্যতা দিয়েই, কথার মাঝে হারিয়ে গিয়ে আমাদের গল্পের চরিত্রেরা চলে এসেছে ময়দান মেট্রো স্টেশনে। যেখানে, তাদের জন্য কি আবার অপেক্ষায় রয়েছে সেই চেনা 'অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স"?


"এবার যেতে হবে তাহলে রাজ। অঙ্কটায় বোধহয় কোথাও হিসেবে ভুল হয়ে গেছিল, তাই আর মেলানো গেল না।"


"আমার অঙ্কে ভুল হয় না, সিমরণ। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক দুইয়েতেই একশো, প্রথম সিমিস্টারেও ইউনিভার্সিটি টপার। আজ হোক বা কাল, LHS=RHS , প্রুভ করবোই!"


রাজের কথা, বলা ভালো 'প্রতিজ্ঞার' সাক্ষী হয়ে থাকা মেট্রোর দরজাটা বন্ধ হতেই, মিলিয়ে গেল সিমরণ।


বরাবরের মতো হাসিটি তার মুখে আজও ছিল বটে, তবে মুখের গোপন বিষণ্নতার রেখাগুলোকেও আড়াল কিন্তু করা গেল না, আর!





ভিড় মেট্রোতে দমবন্ধ হয়ে আসছে রাজের। তবে তা মানুষদের জন্য নয়, এক মানবীর চিন্তায়। অনুভূতিদের গোছাতে এতো সময় লাগে, যে সঠিক সময়টাই পেরিয়ে যায়। এ শুধু রাজের না, আমাদের সকলের সমস্যা। ওই যে শেক্সপিয়র লিখেছিলেন না, "To Be, Or Not To Be"– এই অনিয়তীর খেলাই হলো আসলে, "জীবন।" কঠিন গেম বড্ড। কিন্তু, খেলা ছাড়লে চলবে না। আর এটাই পৃথিবীর একমাত্র খেলা, যেখানে আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, চাইলেও হারতে পারবেন না। আজ হোক বা কাল আপনিই জিতবেন! শুধু, পিচে টিকে থাকতে হবে...


কিন্তু এই মুহূর্তে রাজের কপালে এক শহর মেঘ সমান দুশ্চিন্তার ভ্রুকুটি। তবে কি, সবটাই শেষ?  সিমরণের সাথে তার আর দেখা হবে না? এবং এই, "আর কোনোদিন দেখা হবে না" কথাটা মাথায় আসলেই তার বুকে দুরুদুরু ব্যথা হচ্ছে, হাত পা ঠান্ডা লাগছে– এসব শুধুই মেট্রোর এসি-র জন্য? তাই মানতে চায় রাজ, কিন্তু পারে না।


এই আমাদের দোষ। কিছুতেই মানতে পারি না, আমরাও প্রেমে পরতে পারি! একবার ব্যর্থ হলেও, ভালোবাসা আবার– যতদিন না সঠিক মানুষটাকে আমরা পাই, ইতিহাসের মতো বারে বারে ফিরে আসে। এবার সেই ফিরে আসাটাকে যদি আপনি হেলায় হারিয়ে ফেলেন কেবল অনিশ্চয়তা এবং ভয়ের জন্য, তাহলে ভাই, খুব চাপ!


রাজ এখন ক্রমশ নিশ্চিত হচ্ছে তার অনুভূতিদের ব্যাপারে। কিন্তু... বড্ড দেরি হয়ে গেল কি? উপায় কি আছে আর? সিমরণের ফোন নম্বর বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টও তো রাজের কাছে নেই। মানে সে খুঁজেছিল অবশ্যই, কিন্তু পায়নি। তাহলে...?


আর যখন রাজ হাল ছেড়ে দেওয়ার পথে, ঠিক তখনই আচমকা একটা ব্রেক কষল কলকাতার হার্টথ্রব– মেট্রো। হঠাৎ ঝাঁকুনিতে কম্পার্টমেন্টের বাকি সকলের মতো বেসামাল হয়ে যায় রাজও। আর সেই মুহূর্তে, তার জুতোর সাথে সংস্পর্শ হয় ধাতব কিছু বস্তুর। জিনিসটা দেখে, রাজের চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হলো না। আর চকিতে তার মনের সব অন্ধকার দূর হয়ে গেল।


জিনিসটা হলো, সিমরণের হাতের সেই আংটিটা


কি বুঝছেন তাহলে পাঠক ভাই/ বোন/ দাদা/ দিদি? শরতের শহরে, দেবীপক্ষের আগে এরকম একটু-আধটু ম্যাজিক হয় থাকে। উপভোগ করুন। হয়তো পরের গল্পটা আপনার জন্য তোলা রয়েছে।





১০টা থেকে প্রোগ্রাম শুরু হলে নিশ্চয় সাড়ে ন'টার মধ্যে সিমরণকে কলেজে পৌঁছাতে হবে। এই হিসাব কষে পৌনে ন'টার মধ্যে দমদম স্টেশনে এসে গেছিল রাজ। আর তারপর থেকে, শুধুই অপেক্ষার প্রহর। কখন আসবে সিমরণ? ঘড়িতে সময় তো ছুটে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে ন'টা বাজে। এখনও সিমরণ কে দেখতে পেল না, রাজ। তাহলে?


দেবীপক্ষের সূচনার দিনে, 'উমা' এতো কঠোর হবে তার ছেলে মেয়েদের উপরে?


রাজ ঘামতে থাকে। গতকালের অনিশ্চয়তা বিদায় নিয়েছিল অনেক আগে। কিন্তু সময়ঘড়ি কাঁটা যেরকম উসেইন বোল্ট হয়ে এগোচ্ছে, তাতে অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্সের ভয় ফের জাঁকিয়ে বসছে তার মনে।


ধুরর্! কি যে ছাতার লিখি... শুরু থেকে শেষ অব্দি শুধু 'অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স'-এর সমাহার। এটা গল্প নাকি নিজের জীবনকথা?


নাঃ! আর বেশি ভেবে লাভ নেই। জীবনে প্রথমবারের জন্য অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্সের বিরুদ্ধে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে রাজ। যা হবে দেখা যাবে। ময়দান মেট্রো স্টেশন থেকে সিমরণের কলেজটা কাছেই। একবার একটা কুইজ কম্পিটিশনে সে গেছিল ওখানে। আর সময় নষ্ট না করে, রাজ মেট্রোতে উঠে পড়লো। আজ কিন্তু, মেট্রোটা একদম ফাঁকা!


পাঠক বন্ধু/ বান্ধবী, আর হ্যাজবো না। এবার হয় এসপার, নয় ওসপার। আমি যদিও এখনো জানি না জানেন, শেষটা কেমন হবে। মানে এতো জট পাকিয়ে রেখেছি, খোলাটা এখন চাপের লাগছে আর কি– বুঝতে পারছি না কি করে ছাড়াব ... দেখা যাক, কি দাঁড়ায়! 


ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপিরিয়েন্স না নিয়ে অন্যদের নিয়ে প্রেমের গপ্পো লেখা হেবি ঝামেলার মশাই, হেব্বি ঝামেলা।



১০



সিমরণের কলেজের সামনে এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে রাজ। পাশে দুটি বড় শিউলি গাছের ঝরে পরা ফুল ছড়িয়ে আছে সারা রাস্তা জুড়ে। পারিজাতের স্নিগ্ধ গন্ধে মাতোয়ারা গোটা এলাকা। কিছু বাড়ি থেকে ভেসে আসছে টিভিতে হওয়া কার্টুন মহালয়ার আওয়াজ। এক ঝলক রাজের নিজের ছোটবেলা মনে পড়ে গেল। কিন্তু না। এখন মনকে ডাইভার্ট হতে দিতে গেলে চলবে না। কিন্তু... এখন সে করবে কি? সিমরণের পুরো নাম, সেমেস্টার, ও ডিপার্টমেন্ট জানা আছে তার। কাজেই, কাউকে দিয়ে খবর পাঠাতে হবে। এছাড়া উপায় নেই।


কলেজের গেটের মুখে একটা ছোটো গ্রুপ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কাছেই গেল রাজ। সিমরণের ডিটেলস  দিল তাদের, এবং অনুরোধ করল রাজের সাথে তার একবার ওখানে দেখা করানোর জন্য।


"সে তো বুঝলাম, কিন্তু তোমার নামটা কি বলব হে ভাই?" ওদের মধ্যে থেকে একজন রাজের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে।


দু সেকন্ড ভেবে রাজ উত্তর দেয়, "নাম বলার দরকার নেই। শুধু বলবেন যে, উনি আমায় খুব ভালো চেনেন। এবং আসাটা দুজনের জন্যই ভিষণ প্রয়োজন।"


"এতো বলিউড ফিল্ম লাগছে রে। যা, যা, সিমরণ কে তার রাজের কাছে এনে দে", ওদের মধ্যে থেকে আরেকজন বলে ওঠে। কথাটা শুনে সবাই হাসতে লাগে। মুচকি হাসি, ঠোঁটে ধরা পড়ে রাজেরও। বলিউড সিনেমাই তো বটে। জীবন মানেই তো আসলে আস্ত একটা সিনেমা...


মিনিটখানেক পরেই সিমরণকে দেখতে পেল। লাল শাড়ি, ছাতিম দিয়ে বাঁধা চুলের খোপা ও কাজল চোখে, আজ তাকে অপরূপা সুন্দরী লাগছে। চোখ ফেরাতে পারে না রাজ।


"হাই। সুপ্রভাত।"


"হাই! অপূর্ব সুন্দর লাগছে আজ তোমায়।"


"উফ্! এসেই শুরু। যদিও এখন আমারও তাই মনে হচ্ছে অল্প বিস্তর, যেভাবে আমার আসা ইস্তক তোমার চোখের পাতা পড়ছে না... যাক, তুমি আসলে তাহলে, শেষ পর্যন্ত?" স্বভাবসুলভ হাসি হেসে কথা শুরু করল সিমরণই।


"মানে হ্যাঁ। আসতেই হতো আজ। তোমার অনুষ্ঠান হয়ে গেছে, কি?"


"হ্যাঁ। এইমাত্র শেষ হলো।"


"ইশ্! আমি তোমার আংটিটা এনেছিলাম যেটা তুমি মেট্রোয় ফেলে এসেছিলে। দেরী হয়ে গেল-"


"ওওহঃ! বাগদান কমপ্লিট গাইজ্।" রাজ আংটিটা বের করতেই পাশের সেই গ্রুপটি মজা নিতে লাগল।


"এই! তোরা থামবি? রাজ, ওই শিউলিতলাটার দিকে চলো তো।"


শিউলিতলায় গিয়ে আংটিটা সিমরণকে ফেরত দেয় রাজ।


"আর রাজ, কোনো দেরি হয়নি। তুমি আসবে, আমি ভাবিনি।"


"বুঝলাম না, কিন্তু উহম্... ইয়ে- মানে আর একটা কথা ছিল।"


"কি?"


"হিসাবটা মিলে গেছে"


"হ্যাঁ?"


"হ্যাঁ! বুঝে গেছি যে আবার একটা কাণ্ড করে ফেলেছি জীবনে।"


"কি?"


"কি করে যে বলি... হুর্  বলেই দিই। কি আর হবে?প্রেমে পড়েছি। তোমার।"


"উহু! হয়নি। এটা একটা স্টেপ হলো। Confession. এতে আমার কিছু বলার বা করার থাকে না।"


"সেরেছে- না! সারেনি।" বলেই রাজ পাশের শিউলি গাছ থেকে একটা ফুল তুলে হাতে নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সিমরণের সামনে।


"সিমরণ, 'পলট্। পলট্। পলট্' ওটা চাইলেই বলতে পারতাম, তবে ওটা অলরেডি অন্য একজন রাজ, অন্য একজন সিমরণকে বলে ফেলেছে। কিন্তু বাঙালি তো, তাই 'ভালোবাসি'টা একটু অন্যরকম ভাবে বলতে চাই-


পুজোতে বেরোবে আমার সাথে?"


"শুধু এই পুজোয়?"


"না। না। ছিঃ! ছিঃ!

DDLJ তো চিরকালীন। 'প্রতিটা' পুজোতে বেরোবে আমার সাথে?"


"হ্যাঁ। তবে অষ্টমীর দিন পাঞ্জাবী পরতে হবে, তাহলেই!"


"পুরো পুজো পাঞ্জাবীই পরবো শুধু।"


"থাক। কিন্তু এবার আমার একটা confession আছে।"


"কি?"


"এই আংটি ফেলে আসার প্ল্যানটা আমারই ছিল। তুমি কিছুই বলতে পারছ না দেখে আমি ভাবি একটা শেষ চেষ্টা করে দেখি। তাই কায়দা করে আংটিটা তোমার জুতোর কাছে ফেলে দিই। And, কুড়ি টাকার আংটি, জীবনে অনেক বড় কিছু করে দিল!"


হাসতে হাসতে রাজ আরেকটি শিউলি তুলে সিমরণের খোপায়ে আটকে দেয়। একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে তারা পলকহীন ভাবে, যেই দৃষ্টি বলে দেয়, মুখে ভালোবাসি না বলেও ভালোবাসা যায়- গোটা শহরকে সাক্ষী রেখে, শারদীয়া শরৎকে সাক্ষী রেখে!


বুঝলেন পাঠক, Calculation এ মাঝে মাঝে গণ্ডগোল হওয়াটা দরকার– একটা মাত্র জীবন, সেটাও যদি হিসাব ধরে চলে, তাহলে ভাই খুব চাপ... অঙ্কের খাতা হয়ে কি সারাটা জীবন বাঁচা যায়? 

কাজেই, হিসাব ভুল হোক কোনো কোনো দিন। যেদিন খাতা বন্ধ করবেন, দেখবেন শেষ অঙ্কটা কোনো ভাবে ম্যাজিকের মতো মিলে গেছে– ঠিক রাজ-সিমরণের মতো ! আর, এই ম্যজিকের নাম তো 'ভালোবাসা'–গোটা জগতসভার শ্রেষ্ঠতম শক্তি, ও সর্বোচ্চতম অনুভূতি।


(ফেলে আসা শিউলিতলার স্মৃতিমাখা গন্ধ, ও ভালোবাসার অনুভূতি বাদে এই গল্পের সব কিছুই কাল্পনিক)



I Owe You A December

For those, Who still silently cries alone in the bed, when all the switches go off– May you find your light soon, and for foreve...