Friday, 14 February 2025

এখনও বসন্ত আসেনি...


                                   ১


জানুয়ারির হিমেল ভোর চিরে, চম্বল এক্সপ্রেস বর্ধমান স্টেশনে ঢুকতেই হই হট্টগোলে ঘুম ভেঙ্গে গেল অয়নের। ভাগ্যিস! পরের স্টেশনটাই যে হাওড়া জংশন। যদিও পৌঁছাতে এখনও প্রায় দেড় ঘন্টা; তবু একটা প্রস্তুতি তো আছে।

শীতকালটা দক্ষিণবঙ্গে এবার কেমন যেন। নতুন বছর আসার পরেও, ভোরবেলায় সেই চাদরের মতোন কুয়াশার চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না, তাপমাত্রা পনেরো ডিগ্রির নিচে নামছে না, রাত পড়লে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা আসছে না, গায়ে শীতের পোশাক রাখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে যেন শীতকে এবার কেউ জোর করে ধরে-বেঁধে এনে ফেলে রেখেছে, থাকার তার বিন্দুমাত্র মন নেই।

সব মিলিয়ে, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা না থাকায় শীতের সেই চেনা আমেজটাই এবার পুরো উধাও হয়ে গেছে!

অয়ন আড়মোড়া ভেঙ্গে ফ্রেশ হতে গেল। এসে দেখল মায়ের মিস্ড কল প্রায় আধ ঘন্টা আগে। চটপট মাকে ফোন করতে লাগল সে।

- কি রে? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কি আরো একবার ওই চম্বল রাজ্যে যাবি ঠিক করেছিস?

- আরেঃ রাগ করছো কেন? কতদিন পরে এরকম ভালো ঘুমালাম জানো? আবার ক'দিন যে ঘুম হবে না ভগবান জানে!

- আমায় বলছো কেন? বড়ো হয়েছ। সব একা একা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছ, বোঝো এখন। বছরের শেষটায় বাড়ি আসতে পারল না! এতদিন পরে ফিরছে তো কোথায় বাড়িতে থাকবে, তা না। যত্তো সব!

- হাঃহা! মা। মিষ্টি মা আমার। এতদিন পরে বাড়ি ফিরছি আর পুরো বকাটা ট্রেনেই বকবে? একটু বাড়ির জন্যেও বাঁচিয়ে রাখো।

- বড়ো বাচাল হয়েছিস তুই। যাকগে। এই, উমা তোর সাথেই আসছে তো?

মুহূর্তে থমকে গেল অয়ন। মনে হলো ট্রেনটা শুধু দাঁড়িয়েই পড়েনি, কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে আর ওর পায়ের তলা থেকে সব মাটি আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে।

একটা নামের, এতো শক্তি? এতো মায়া?

- না। ওর বেশ কদিন আগে কাজ হয়ে গেছিল। ও আগে এসেছে। ঠিক আছে মা, এবার রাখছি। ফোনটা চার্জে দিতে হবে।

-ওহঃ। আচ্ছা। সাবধানে আয়।

মোবাইলটা রেখে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকল অয়ন। মা কে মিথ্যে কথা বলতে ভালো লাগেনা তার। পারেও না। চিরকাল মিথ্যে বলতে গেলেই মা ধরে ফেলে। তাই তড়িঘড়ি ফোনটা রাখতে হলো।

আর, মিথ্যে বলতে তো অয়নও চায় না।

কিন্তু, সব কি আর চাইলেই পাওয়া যায়?


                                   ২


"রাত ৩টের ভাবনাগুলো, ঠিক ফেলে আসা শীতের মতো... না চাইতেও কি করে যেন চলেই আসে। আস্তে আস্তে জমাট বাঁধে...আর তখনই, বাইরে খুব করে কুয়াশা পড়ে। ঘন কাচের দেওয়ালের পাড়ে কারা যেন কিসব আঁকিবুঁকি কাটে। আমাবস্যার জ্যোৎস্না, চুপটি করে সব দেখতে থাকে।

একটু পড়ে জ্ঞান ফেরে যখন, বোঝা যায়; ওদের নাম 'মুহুর্ত'। কেউ বা আবার আদর করে ওদের 'স্মৃতি' বলেও ডাকে...।"


ফোনের ঘড়িতে ৭'টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে রেগে থাকা মোরগের বিকট চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে, ধড়ফড় করে উঠে বসল উমা। কাল রাতে একটা অডিওবুকের স্ক্রিপ্ট লিখতে বসে একেবারে বিশ্রী ভাবে ঘুমিয়ে পড়েছিল ও। এখন যদিও স্ক্রিপ্টটা নিয়ে তেমন চাপ নেই, তবু উমা একটু গুছিয়ে রাখতে চেয়েছিল কাজটা। দুদিনের বেশি শুয়ে-বসে কাটানো তার আবার একদম পোষায় না।

পুরোটা তাহলে খুলেই বলা যাক।

২ মাস মতো হয়েছে উমার মাস্টার্স শেষ হয়েছে। তারপর দিল্লিতে একটা রেডিও স্টেশনে কদিনের জন্য ইন্টার্নশিপ শেষ করে, তিনদিন হয়েছে সে কলকাতার একটা নামজাদা প্রোডাকশন হাউসের অফার লেটার পেয়েছে। জয়নিং এখনো প্রায় মাসখানেক পরে। কাজের চাপ তাই এখন তেমন নেই উমার জীবনে।

- ব্রেকফাস্ট করে আগে সব লাগেজগুলো একবার চেক করে নিস। তুই যা ভুলো মন, দেখ কত দরকারি জিনিস ফেলে রেখেছিস। একটু কিছু ভালো করে গুছিয়ে রাখবি না।

বাবার কথায় ঘুম কাটে উমার। এক ঝলক কাল রাতের লেখাটার দিকে তাকায় সে।

আনমনেই একটা ম্লান হাসি খেলল উমার ঠোঁটে।

বাবাকে আর কি করে সে বোঝায়, কিছু জিনিস অতীব যত্ন নিয়ে আগলে রাখলেও, শেষ ওব্দি গুছিয়ে রাখা যায় না!


                                     ৩


প্রায় ছয় মাস পর, আজ ফের উমার সাথে মুখোমুখি হতে চলেছে অয়ন।

দেখা তো হবে।

কথা হবে কি?

কলকাতায় আজকাল আর হলুদ ট্যাক্সি, ট্রাম- এসব দেখতে পাওয়া যায় না। সরকার উঠিয়ে দিয়েছে। অয়নের মনে হয়, তাই জন্যই কি এবারে এতদিন পরে এসেও শহরের নিরব গলিগুলো, জ্যামে জীর্ণ বড়ো-রাস্তাগুলো, আর ওকে আপন ভেবে ওদের সুখ-দুঃখের গল্প জমাচ্ছে না?

তাই কি বারবার ঘুরেফিরে একঘেয়ে মন-খারাপী ভাবনাগুলো আসছে?

মোবাইলের আওয়াজে ঘোর কাটল অয়নের। ওর বন্ধু ইন্দ্রনীল ফোন করেছে।

- কি রেএএএ ভাই! নামলি হাওড়াতে?

- রাজপথে। রথ যানজটে ক্যাব হয়ে আটকে পড়েছে।

- আরেহঃ রাস্তায় নাকি? কাঁপিয়ে দিয়েছিস! উমা আছে তো সাথে?

- ..........

- কি রে? হ্যালো? শুনতে পারছিস না? এই কোম্পানিগুলো আর মানুষ হবে না!

- না। উমা আগে এসেছে।

- ওহঃ। সে ঠিক আছে। আরে ভাই তুই ভাবতে পারছিস, যে লাস্ট আড়াই বছর ধরে ভেবে চলা ফ্রেন্ড'স ট্রিপটা নামছে? উফফ! ভাবতেই একটা যাচ্ছেতাই রকমের এক্সাইটমেন্ট হচ্ছে! সেই যবে থেকে তোর আর উমার লাভলি অ‍্যাক্সিডেন্টটা হলো, তবে থেকে বোধহয় ভাবছি।

- আচ্ছে ভাই, তুই রাখ এখন। ফোনে চার্জ নেই।

- বেশ বেশ। আমি রাপূর্ণা আর অগ্নির খবরটা নিই।

ফোন রেখে অয়ন শান্ত ক্যাবের ভিতরে, চুপচাপ বসে রইল।

জীবনে, মাঝে মাঝে কেবল এরকম চুপচাপ বসে থাকার খুব দরকার। নিজেকে, বা আসলে হয়তো সময়কে, বোঝার জন্য।

বছর দুইয়েক আগে সেবার বসন্তকালে অয়ন আর উমার ব্রেকাপটা ঠেকানো গেলেও, এবার আর যায়নি। লং ডিস্টেন্সের কঠিন বাউন্সারগুলো দুজনে খুব ভালো ভাবে সামলাতে পারলেও, পিচে টিকে থাকা দিনকে দিন কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। পরস্পরকে সময় দিতে না পারার সেই একঘেয়ে অভিযোগটা ছাড়াও, এবারে ওদের মাঝে এসে পড়েছিল অসহিষ্ণুতা নামক এক ভয়ংকর দৈত্য।

না কারোর একার দোষ ছিল না। এসব ক্ষেত্রে, দোষী মানুষ দুটো নয়; আসলে হয় 'পরিস্থিতি'। তার একার অঙ্গুলিহেলনে সবাই চলতে থাকে। আর অল্প বয়সের বাড়তি ইগো তো থাকেই। দুজনেই বোকার মতো অন্যজনের থেকে বাড়তি একটু এফর্ট চেয়ে বসে। কেউ একবারও ভাবে না, ওই বাড়তি চাওয়াটুকু নিজেরা ভাগাভাগি করে নিলেই সব সমস্যার নিশ্চিত সমাধান হয়ে যায়! ভালোবাসা জিতে যায়, আর এই ইগো, অভিমান, সেল্ফ রেসপেক্ট; এই মহান শুনতে লাগা আদতে অপশব্দগুলো হেরে যায়!

কিন্তু ওই যে, কেউ ভাবে না!

তাই গত বর্ষা শেষের কোনো এক বিকেলে, মোবাইলের ভিডিও কলে আনুষ্ঠানিক ভাবে ব্রেকাপ হয় অয়ন এবং উমার।

আচ্ছা, যেই মোবাইলের আবিষ্কারই হয়ে ছিল কথা বলার জন‍্য, শব্দ বিনিময়ের জন্য, তাতেই যখন দুই প্রান্ত থেকে কেবল নিরবতা বয়ে; তখন ওই মোবাইল ফোনটার মনেও কি আকাশ ভরা অভিমান জমে?

কি জানি!


                                    ৪


ওদের গ্রুপের বাকিদের মতো, উমাও প্রথমবার কেবল বন্ধুদের সাথে বেড়াতে যাচ্ছে। আজ লাগেজ গোছানোর ফাঁকে হঠাৎ কথাটা মনে পড়ায় নিজের মনেই অবাক হয়ে উঠল উমা। কি জাদুবলেই না তার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল রাপূর্ণা, অগ্নি, ইন্দ্রদের সাথে!

ওরা সবাই অয়নের স্কুলের বন্ধু। নভেম্বরের এক ছুটিতে ময়দানের আড্ডায় ওদের সাথে প্রথম দেখা উমার। ব্যাস! সেইদিন থেকেই গড়ে উঠল বন্ধুত্ব। রাপূর্ণার সাথে তো সে প্রায় নিজের দিদির মতো মিশে গেল।

এমনকি অয়নের সাথে ব্রেকাপের পরেও, সেই সম্পর্কে কোনো চিড় ধরেনি। রাপূর্ণা, অগ্নি, ইন্দ্র, সবার সাথেই বন্ধুত্ব অটল আছে। এমনকি অয়নের সাথেও প্রথম প্রথম কিছুদিন কথা হতো টুকটাক....

কেবল ইন্দ্রকে এই ব্রেকাপের কথাটা বলে উঠতে পারেনি উমা। অয়নও পারেনি। ওরা দুজনেই জানে যে বাকিরা বয়সের সাথে সাথে পরিণত হয়ে উঠলেও, ইন্দ্র এখনও ছেলেমানুষই আছে। আর সত্যি বলতে কি, ওর এই ছেলেমানুষীর জন্যই, ওদের সবার মধ্যের বন্ধুত্বটা বেঁচে আছে। ইন্দ্র সবাইকে একটা চুম্বকের মতো করে আটকে রাখে, ছেড়ে যেতে দেয় না।

আর অয়ন, উমা; দুজনেই খুব ভালো করে জানে, ওদের ছাড়াছাড়ির খবর শুনলে ছেলেটা একদম ভেঙ্গে পড়বে। ওদের থেকেও হয়তো বেশি কষ্ট ও পাবে। সেটা ওরা কোনোভাবেই চায় না।

তবে রাপূর্ণা, অগ্নি জানে। রাপূর্ণার সহচর্জেই কঠিন দিনগুলো কাটাতে পেরেছে উমা। দূরে থেকেও, বড়ো দিদি হয়ে সে আগলে রেখেছিল উমাকে। এই ট্যুরটাতে আসার জন্যও সেই রাজি করায় উমাকে।

ময়দানের সেইদিনের আড্ডাটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে উমার। প্রথম দেখাতেই ইন্দ্র দৃঢ় কন্ঠে বলেছিল, "এই গ্রুপটার বরফে ঢাকা কুল্লু-মানালি ট্যুর করিয়েই ছাড়ব, দেখি কে আটকায়। ভারত সরকারের কেন, ভগবানেরও সাধ্যি নেই!"

নাহঃ ভগবান বাঁধ সাধেননি। ইন্দ্রর কথা অনুযায়ী ওরা সত্যিই বন্ধুরা মিলে আজ রওনা দিচ্ছে, মানালি।


                                    ৫


মুহুর্তদের নিয়ে যতই হাসি ঠাট্টা করি না কেন, সময় বিশেষে কিন্তু তারা আজও থমকায়। হয়তো আমাদেরই অহেতুক আসকারা তে, তবু, থমকায়।

আজ যেমন তারা থমকেছিল হাওড়া স্টেশনে। যখন ছয় মাসেরও বেশি সময় পরে, অয়ন এবং উমা, মুখোমুখি হয়েছিল। দুই তরফেই বুকের ভিতরে থাকা অজস্র আগ্নেয়গিরিরা হঠাৎ নিভে গিয়ে, এক আশ্চর্য অভিমানের জন্ম দিয়েছিল।

যে অভিমানে, পরস্পরকে দেখে মৃদু হাসা থাকলেও, 
কথা বলা বারণ!

আচ্ছা; অভিমান আমরা যার তার উপরে কি করতে পারি আদৌ?

যাত্রাপথের প্রথম রাতের আড্ডাটা তেমন জমেনি। কালকা পৌঁছাতে আরও দুদিন প্রায়। তাই আড্ডার সময়ের অভাব হবে না ভেবেই রাতটা বিশ্রাম নেওয়া ঠিক বোধ করল সকলে।

পরের দিনটা আড্ডায়, গানে, গল্পে দুর্দান্ত কাটল সবার। সকলের মাঝে থাকার ফলে, অয়ন আর উমার অস্বাভাবিকতাটা খুব বেশি প্রকট হয়নি। তবে ইন্দ্রর ওদের নিয়ে করা মজাগুলোয় মাঝে মাঝে বেশ তাল কাটছিল। এর মধ্যে এক-দুবার উমার সাথে টুকটাক অত্যন্ত সাধারণ কিছু কথা হয়েছে অয়নের। একদম নিতান্তই নিয়মমাফিক।

একসাথে বন্ধুদের এই ট্যুরটা প্রায় একটা স্বপ্নের মতো ছিল ওদের কাছে। আজ সেই স্বপ্ন যখন বাস্তবে হচ্ছে, আনন্দের সাথে সবার মনেই কেমন একটা আশ্চর্যভাবও খেলছে।

রাতে ঘুমানোর আগে ইন্দ্রই কথাটা পাড়ল।

- ট্রেন একদম কারেক্ট টাইমে চলছে। কাল ৯টার মধ্যে মানালি ঢুকতে পারলে জমে যাবে ব্যাপারটা পুরো।

- মানালিতে সন্ধ্যা ৭টাতে ঢুকলেও জমব। কি ভেবে যে তুই একই দিনে ট্র্যাভেলটা রাখলি ভগবান জানে! সবেতে বেশি মাতব্বরি।

বেশ ঝাঁজের সাথে বলল রাপূর্ণা।

- হ্যাঁ রে... মাতব্বরি করি বলে আজকে প্ল্যানটা বাস্তবে ফলছে। আর প্ল্যানে আটকে নেই।

- আহঃ। তোরা দুজনে আবার ঝগড়া শুরু করলি? চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়। যা হবে দেখা যাবে।

রাপূর্ণা আর ইন্দ্র সেই স্কুলজীবন থেকেই এরকম কথায় কথায় ঝগড়া করে। আর প্রতিবারেই তা থামাতে হয় অয়নকে। অগ্নি চিরকাল এইসব মুহুর্তে শুধু মিটিমিটি করে হাসতে থাকে। আজও তার কোনো অন্যথা হলো না।

রাতের ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে এখন ফিরে ফিরে আসছে হারানো স্কুলবেলা, ক'দিন আগে প্রাক্তন হওয়া কলেজ লাইফ, সদ্য জয়েনিং-এর চাকরি; ইত্যাদি সহ জীবন নামক নানান অভিজ্ঞতার আস্ত একটি গল্প সংকলন...।


                                    ৬


- তোর ট্রেনে ঘুম না আসার অভ্যাসটা তাহলে আর গেল না।

কালো নিঝুম রাত্রি চিড়ে, আচমকা ইন্দ্রর বলা কথা গুলোয় হকচকিয়ে গেল অয়ন। বরাবরের মতন সে আজও রাতে ট্রেনে ঘুম না আসায় গেটে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

- তুই এখানে? ঘুমাসনি?

- নাহঃ। ভেঙ্গে গেলই যখন, ভাবলাম একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। আর জানতাম, তোকে এখানেই পাব।

- হুঃ। বাকিরা সবাই ঘুমাচ্ছে তো?

- হ্যাঁ। তা তো ঘুমাচ্ছে। কিন্তু তুই আমায় বল তো, ব্যাপারটা কি?

- কিসের ব্যাপার আবার?

- তোরা কি ভাবিস বল তো আমায়? কিছুই বুঝি না আমি? হ্যাঁ, মানলাম ছেলেমানুষীটা যায়নি। তা বলে এতটাও গাধা নই যে কিছু বুঝব না। ওইটুকু ম্যাচিউরিটি এসেছে রে ভাই!

- তো কি বুঝলি?

- এটাই যে, সব কিছু ঠিক নেই। তোর আর উমার মধ্যে একটুখানি দূরত্ব এসে পড়েছে। যদিও এটা পুরোটাই আমার অনুমান। তুই বল এবার। সত্যি বল। কতটা ঠিক, আর কতটা ভুল।

- (কিছুক্ষন থেমে) একটাই ভুল। দূরত্বটা একটুখানি নয়, একটা আস্ত আলোকবর্ষ।

- হুহঃ! ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম। যাইহোক; এবার অন্তত আশা করি, পুরোটা খুলে বলবি?

ইন্দ্রকে অয়ন সমস্ত ঘটনাক্রম বলে যেতে লাগল। নিজেই বুঝতে পারল বেশ কয়েকবার গলার কাছটায় দলা পেকে যাচ্ছে। এমন কেন হয়? ওর তো মুভ অন্ করে যাওয়ার কথা। গভীর রাতে নিজের মন কে তো এরকম ভাবেই মিথ্যে সান্ত্বনা সে দিয়ে এসেছে এতদিন।

আজ কেন তাহলে চোখের কোণ ফের শিশিরদের বাসস্থান হচ্ছে?

- কি রে? কাঁদছিস কেন? ভালোবাসাটা খাঁটি ছিল, তোঃ? তাহলে বিচ্ছেদেই বা কিসের কান্না?

- এটা তুই বলছিস ইন্দ্র? তোর সত্যিই মনে হয় আমাদেরও বাকিদের মতো ক'টা বছর শুধু প্রেম করার কথা ছিল?

- ভালোবাসিস তো এখনও?

- গত ছয় মাসে "ভালোবাসি না"- এই মিথ্যেটা নিজেকে বলতে বলতে আমি ক্লান্ত। আর ভালো লাগে না।

- ডাক্তার কি করে হলি রে তুই? কবি বা লেখক হতিস। যত বার ভাবি সিরিয়াস হবো, তোরা হতে দিস না। ঝেড়ে কাশবি কি?

- সেই বড়োদিন এর দিন প্রথম দেখা হওয়ার মুহুর্তটায় যতটা ভালোবেসেছিলাম; আজও ততটাই ভালোবাসি। বেশি বই তো কম নয়!

- এই তোঃ। কি সুন্দর কথা। তাহলে আটকাচ্ছেটা কিসে তোদের ভাই? প্যাচাপটা করে নে।

- কোনো কিছুই কি এক তরফা হয়, ভাই? আর আমি তো জানি না... ও হয়তো মুভ অন করে নিয়েছে।

- হ্যাঁ মানলাম। হয়তো। যদিও আমি শিওর যে উমা করেনি। তবুও তুই একবার চেষ্টাটুকু করবি না?

- জানি না রে, কি করে এগোবো। আদৌ পারবো কি না, সেটাও জানি না। আসলে হঠাৎই এতটা কাছের থেকে কি করে যে এতো অপরিচিত হয়ে গেলাম, বুঝতে পারছি না!

- দেখ। তুই কি করবি, বলবি, বা উমার রিয়্যাকশন কি হবে, আই ডোন্ট নো! বাট এটুকু আমার মন বলছে, তোদের গল্প এখনও বাকি। যদি ভালোবেসে থাকিস, একটা সেকেন্ড চান্স নিয়ে দেখ। এরকম ভাবে হারিস না।

অয়নের কাধে হাত রেখে, বলে ওঠে ইন্দ্র। সদা হাসিখুশি, ফাজলামি করতে থাকা সেই ছোটবেলার বন্ধুটাকে কখনও এতো বুঝেশুনে কথা বলতে শোনেনি অয়ন। সে অবাক হয়। সহমতও বোধহয়।

- দেখ অয়ন। জীবন হোক বা ভালোবাসা, সবেতেই একটা সেকেন্ড চান্স এর খুব প্রয়োজন। আর সেটা কিন্তু সবাই পায় না। কাজেই তোর কাছে সুযোগ যখন আছে, সেটাকে কাজে লাগা। তোর তো আর হারানোর নেই কিছু। কথা তো হয়ই না বললি তোদের এখন। অয়ন, সাহস করে এগো। আমার মতো হোস না। সারাটা জীবন বুকে অকারণ আফসোস নিয়ে বেঁচে থাকাটা কিন্তু খুব কঠিন। খুব!

আমার নিজের এই ব্যাপারে জানিস, দারুন একটা থিওরি আছে। আমার মতে প্রথম চান্স, বা ওই প্রথম দেখা ও ইত্যাদি, এটায় আমাদের বিশেষ কোনো ভুমিকা নেই পুরোটাই ভগবানের লীলা। তবে দ্বিতীয়বারটা পুরোটাই আবার আমাদের উপরে। একবার ভগবান তোমার সহায় হয়ে, সব দেখিয়ে, বুঝিয়ে দিল... কিন্ত এরপরে পুরো গেমটাই তোমার ওপর। আর আগেই বললাম, এই দ্বিতীয়াবার খেলার বা ব্যাটিং করার সুযোগ সবাই পায় না। কাজেই মাঠে নামলে, রান তোকে করতেই হবে!

ওহ্ বাই দা ওয়ে, উমা কিন্ত জেগেই আছে। ইনফ্যাক্ট ওই আমায় বলল একটু তোকে দেখে আসতে কি করছিস কি না, ওর নাকি আবার শরীর খারাপ।

সময় বিশেষে মানুষের এই শরীর খারাপ হওয়ার অসুখটা আর গেল না।

এ পুরো স্কুল লাইফের হোমওয়ার্ক এফেক্ট। পুরো...!"


                                  ৭


পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য তো অনেকেই অনেক কিছু বানিয়ে নিয়েছে। সেসব আর ঘাঁটাচ্ছি না। তবে, নবম আশ্চর্য বলে যদি কিছু থাকে, সেটা হলো দূরপাল্লার ট্রেনের ঠিক সময় চলা, বা কোনোদিন সময়ের আগে গন্তব্যস্থলে পৌঁছনো।

আর আজ, আমাদের গল্পের ঠিক সেটাই হয়েছে।

দুপুর দুটো বাজার কিছু মিনিট আগে, ট্রেন থামল কালকা স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়ি ঠিক করাই ছিল। ছয় ঘন্টার যাত্রাপথ পেড়িয়ে ওরা কুল্লুতে পৌঁছল যখন, ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে সাতটা। নদির ধারে ওদের দুটো ক্যাম্প বুক করা ছিল। ছেলে ও মেয়েদের জন্য দুটো আলাদা ক্যাম্প।

আজ বরফ না পড়ায় ওরা ভাগ্যক্রমে কুল্লুতে পৌঁছাতে পারল। একবার বরফ পড়তে শুরু করলে, রাস্তাতেই যে কতো ঘন্টা, আর কতদিন আটকে থাকতে হতো; তাঁবুর বাইরে এখন কফি ও পকোরা সহযোগে সেই হিসাব কষতে কষতে ইন্দ্রকে তুমুল ঝাড়ছে রাপূর্ণা। অয়ন কেন, আজ অগ্নিও হাসি ছেড়ে ওদেরকে থামাতে গিয়ে ব‍্যর্থ হয়েছে। উমাও তাই।

অগ্নি এবার থামানোর আর কোনো উপায় না দেখে কথাটা ঘোড়ানোর চেষ্টা করলো।

- আরে তোরা আবার বর-বৌ এর মতো ঝগড়া শুরু করলি? অয়ন, উমাও বোধহয় এই লেভেলে যায় না।

- এইঃ। সেরা টপিক পারলি তো। এবার এটা একটু দেখতে হবে।

রাপূর্ণা কথার উত্তরে ইন্দ্র কিছু বলতে যাচ্ছিলই কি অগ্নির ছোট্ট চুপ করে যাওয়ার ইশারা দেখতে পেয়ে থমকে গেল। ইশারাটা আবার রাপূর্ণার দিকে করেই না, তাই আর কি।

- হ্যাঁ। তো ব্যাঙ্গমা- ব্যাঙ্গমী; এই "টুকি, ধপ্পা"-র লুকোচুরি খেলাটা আর কদিন চলবে?

- মানে? কি বলছিস? তোরা কি কিছু জানিস না, এমন করছিস? হ্যাঁ। মানলাম ইন্দ্র কিছু জানে না, ওর বলাটা মানায়। তা বলে...

- এইইইই! অব্জেকশন্! একদম চোখ দেখাবি না অগ্নি, আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেব। উমা- আমি সব জানি। আর হ্যাঁ রে, তোদের লজ্জা বলে কিছু নেই? না সে তো নেই, ডেফিনিটলি, ছোটবেলা থেকে দেখছি সবগুলোকে। তোরা কেউ একবার আমায় কিচ্ছু জানালি না? ছিইইইঃ!

- তুই কি তোর বাংলা সিরিয়াল মার্কা মেলোড্রামা বন্ধ করবি? নইলে কিন্তু...

রাপূর্ণা হাতের মুঠি পাকিয়ে তেড়ে যাবেই কি অগ্নি বাঁধা দিল।

- দাঁড়া। দাঁড়া। তুই কি করে জানলি? তোকে তো আমরা কেউ বলব না ভেবেছিলাম।

- হ্যাঁ। তা তো বটেই!! আমায় অয়ন বলেছে।

এরপরে ইন্দ্র কাল রাতে তার সাথে হওয়া অয়নের কথার কিছুটা অংশ সবিস্তারে শোনাল সকল কে। তবে এড়িয়ে গেল অয়নের চোখে জল, সেকেন্ড চান্স এর গল্প, আর উমার জেগে থাকার কথা।

- বাহ! এই তো ইন্দ্র কেমন বড়ো হয়ে গেছে। তাহলে বাকিটুকু বাদ রাখিস কেন, রাপূ? ওরা দুজনেই জানুক দুজনের দুজনকে ইনডাইরেক্ট স্টকিং এর কথা।

- কিইইইই?!

একজোড়া "কি" এর আওয়াজে যেন কেঁপে উঠল নিরব পাহাড়ভুমি। গলার স্বর ছাপিয়ে গেল স্রোতশ্বিনী বিয়াস নদী কে ও। এই মুহুর্তে ক্যাম্পের বাইরে বনফায়ার, পকোরা ও কফি নিয়ে পাঁচজন বন্ধু যারা বসে আছে, সবাই এর ওর দিকে তাকাচ্ছে। চাপা একটা টেনশন, "কি হয় কি হয়" ভাব সবার মুখে। অগ্নিই আবার শুরু করল কথা।

- কিরে! সবাই এতো অবাক হচ্ছিস যেন কেউ কিচ্ছু জানতিস না। এই রাপূ, তুই বলবি না? 

- হ্যাঁ। বলেই দিই। উমা শোন, তোদের ব্রেকাপের খবরটা প্রথম অয়নই আমায় দেয়। আর তার সাথে ফোনে কাঁদতে কাঁদতে বলে, তোকে যেন কোনোভাবে সামলে নিই।

.......

(অয়ন ও রাপূর্নার মধ্যে সেইদিনকার ফোনের কথোপকথনের রেকর্ডিং)

- রাপূ, প্লিজ তুই কোনোভাবে ওকে সামলে নিস। এই ব্রেকাপটার ফলে ও প্রচণ্ড কষ্ট পাবে, জানিস। আর আমি...আমি তো চাইওনি, এখনও ইনফ্যাক্ট চাইনা যে আমাদের সম্পর্কটা ভেঙে যাক। চেষ্টাও করলাম কতো, কিন্তু... হাঃ! কি করব বল।

তুই প্লিজ ওকে আগলে রাখ। তোকে তো আমি ছোট থেকে বন্ধুর থেকে বেশি বড়ো দিদির মতো করে দেখেছি। প্লিজজ্ এই কথাটা আমার রাখ।

- বুঝেছি আমি। এতবার প্লিজ না বললেও হবে। কিন্তু, কি করলি বল তো এটা তোরা!

- জানিনা রে। জীবনের সবথেকে বড়ো ভুল বোধহয়। কিন্তু তোকে আর একটা কাজও করতে হবে।

- কি?

- কাজটা কিছুটা অনৈতিক। তাও, না বলিস না। তুই প্রত্যেকদিন আমায় উমার সম্বন্ধে জানাস। মানে কেমন আছে, কি করছে, সময়ে খাওয়া দাওয়া করছে কি না, পড়াশুনা, কাজ কেমন চলছে... এইটুকুই আর কি। নিজে তো আর কথা বলতে পারব না, তাই তুই আমায় বলিস।

- This is not fair! কেন?! ব্রেকাপ হওয়ার পর আবার কি এগুলো?

- হুহ! ব্রেকাপ হয়ে যাওয়া মানেই কি ভালোবাসা ফুরিয়ে যাওয়া রে? বোঝা আমায় যদি পারিস। যেদিন ওকে আর ভালোবাসব না, মুভ অন্ করে যাব... আর কিচ্ছু জিজ্ঞেস করব না। ততদিন... প্লিজ না বলিস না।

......


মোবাইলের রেকর্ডিংটা বন্ধ করে রাপূর্ণা। অয়ন মুখে হাত ঢেকে বসে আছে। উমাও পাথর প্রায়। গাল দুটো তাদের পরিচিত লাল রঙে রাঙা হয়েছে, বহুদিন পর। উমার চোখের আড়ালে, কিছু একটা চকচক করছে।

সেটা সাধারণ অশ্রুজল না শীতরাজ্যের কোনো বেনামী গল্পের কাব্যপ্রিয় বরফকণা, রাতের আলোয় ভালো করে বোঝা যায় না....!


                                    ৮


- আরে। এতো তাড়াতাড়ি মাথা হাত দিলে, কাঁদলে হবে তোদের? দাঁড়া। আগে আরেকটা রেকর্ডিং শোন তো।

রাপূর্ণার রেকর্ডিংটা বন্ধ হওয়ার পরেই বলে উঠল অগ্নি।

.....

- অগ্নি, প্লিজ আমার এই হেল্পটা কর। রাপূর্ণা আমায় বড়ো দিদির মতো আগলাচ্ছে ঠিকই। বাট্, ওকে আমি এটা বলতে পারব না।

- তোদের তো ব্রেকাপ হয়ে গেছে। তাও অয়ন কি করছে, কেমন আছে, আবার ডিপ্রেশনে ভুগছে কি না.. এসব জেনে কি করবি বল তো? যত জড়িয়ে পড়বি, ততই কষ্ট পাবি।

- (কিছুক্ষণ থেমে) কি করব বল তো? "বিচ্ছেদ" শব্দটা তো "ভালোবাসা" ছাড়া অনর্থক। ভাবলি কি করে তাহলে, এতো তাড়াতাড়ি ভালোবাসাটাও চলে যাবে? আমরা পরিস্থিতির কাছে, সময়ের কাছে, বা মানুষের কাছে হার মানি রে বেশিরভাগ সময়, ভালোবাসার কাছে নয়! প্লিজ হেল্পটা করিস আমার। আর, খেয়াল রাখিস যাতে ওর ডিপ্রেশনটা কোনোভাবেই রিল্যাপ্স না করে। প্লিজ!

......


অগ্নি মোবাইলটা বন্ধ করার সাথে সাথে, ইন্দ্র দাঁড়িয়ে উঠল।

- উফফফ্! ভাই বোনেরা আমার। প্রণাম তোদের। কি খেলটাই না দেখালি সব! বলিউড ফেল। শেক্সপিয়ার বেঁচে থাকলে আরো ২৫ খানা নাটক লিখে যেত তোদের নিয়ে। আর ৫০টা কবিতা। কিন্তু অ‍্যাজ্ আ ল'ইয়ার বলছি, কল রেকর্ড করে তোরা দুজনেই কিন্তু খুব গর্হিত কাজ করেছিস।

- আর একটা কথা বললে তোকে খুন করে দেব আর বডি গুম। কেউ কেস লড়তেও যাবে না তোর হয়ে। চুউউপ্!

রাপূর্ণার হুঙ্কার শুনে আর কিছু না বলে ইন্দ্র চুপ করে যায়।

- এই তোরা থাম তো। যাকগে আমাদের কাজ আমরা করে দিয়েছি। এবার তোমরা ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী বোঝো কি করবে। চল রে তোরা, তাঁবু তে ঢোক। কিছু শেখাতে পারলাম না আমি আর কাউকে.....

অগ্নি কথাগুলো বলার সাথে সাথে ইশারায় রাপূর্ণা আর ইন্দ্রকে উঠতে বলে।

বিয়াস নদীর তটে, এখন দুটো একাকী মন, পাশাপাশি বসে রয়েছে। এক মহাসাগর কথা তাদের মধ্যে বাকি... কিন্তু কেউই শব্দ ধার করে এগোতে আর পারছে না।

আসলে সাগরেরও মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়। লোকে বলে, তখন নাকি ঝড় ওঠে। আর যখন সেই ঝড় থেমে যায়... এক অদ্ভুত শান্তির সুবাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

দেবভুমি হিমাচলে আমাদের গল্পের নায়ক-নায়িকাদের মধ্যে, তেমনই এক সুবাস ছড়িয়েছে বোধহয় এখন। তাই কি এতো নিরবতা?

কি জানি!


                                   ৯


- এখানে এখনও বসন্ত আসেনি। কি শীত, তাই নাহঃ?

কতক্ষণ ধরে যে ওরা চুপ করে শুধু বসে ছিল, কেউই হিসাব রাখেনি। শেষ ওব্দি, আর ধৈর্য্য না ধরতে পেরে, অয়নই কথা শুরু করল।

- এখনও রেগে আছিস?

কিছুক্ষণ থেমে, আবারও অয়নই কথা বলতে লাগল। দুবছর ওদের সম্পর্কটা গড়ানোর পরে কোনো এক দিন কোনোভাবে "তুমি"টা "তুই"য়ে নেমে এসেছিল, পরস্পরের জন্য। আরও কাছের লাগে বোধহয় শুনতে, তাই। আজও তাই-ই বজায় থাকল।

- এটাকে যে ঠিক কি বলে, রাগ, না অভিমান, নাকি কষ্ট... আজও বুঝে উঠতে পারলাম না রে।

কুল্লুর আকাশে আজ এক ফোঁটা মেঘ নেই। স্বচ্ছ, স্পষ্ট আকাশে হাজারো তারার মেলা। ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য ব্যাপারটা খানিক অস্বাভাবিকই বটে।

উমার গলার স্বরে সেই আকাশের হাজারো তারা একসাথে লক্ষ নক্ষত্রের মতো জ্বলে উঠল।

"হাই", "হ্যালো"-র বাইরে, তাও কতদিন পরে যেন ওদের কথা হলো?

- আমিও রে। কি কথা যে বলব এখন বুঝতে পারছি না। দুজনেই তো তাহলে গত ছয় মাসে পরস্পরের সব কথা জানি।
- তা বলাই যায়। ওহঃ! ফাইনালি তাহলে তুই কলকাতায় ফিরলি। শুনেছি মাস্টার্স নাকি আর বাইরে করবি না।
- হ্যাঁঃ। আর ভালো লাগে না বাইরে থাকতে। দম আটকে আসে। এইবারেই সব চুকিয়ে এসেছি। ইন্টার্নশিপও শেষ, প্রবাসী হওয়াও।
- হ্যাঁ। আমিও...
- হ্যাঁ। কি খুশি হয়েছিলাম রে তুই ওই হাউসটায় জয়েন করছিস শুনে। তোর তো অনেকদিনের শখ ছিল।
- হ্যাঁ, আমি জেনে গেছি, যে তুই সবই জানিস।

আর থাকতে পারেনা উমা। অয়নের কথা শুনে সে হেসে ওঠে বলে। উমাকে এতদিন পরে হাসতে দেখে, অয়ন ও হাসে।

নদীর জলের কলকল আওয়াজ যেন মুহুর্তে কিছুটা জোরে হয়ে যায়। শীতের কামর মেশানো একটা দমকা হাওয়া হঠাৎই বয়ে যায় বটে, তবে তাতে মিশে থাকে এক ফিরে পাওয়া উষ্ণতার পরশ। ওই যে নক্ষত্রদের কথা বলছিলাম... ওদের যেন আরও বেশি উজ্জ্বল লাগছে এখন। ওরাও কি হাসছে নাকি?

ছোট থেকে যে সবাই বলত মৃত মানুষেরা আসলে তারা হয়ে যায়; তাহলে মানে দাঁড়াচ্ছে অকালে বসন্ত আসলে, মৃত মানুষেরাও হাসতে পারে?

ভালোবাসার এতো শক্তি? এতো মায়া?


                                   ১০


- কি রে! আর কতক্ষণ বসে থাকব আমরা এখানে? এবার তাহলে উঠি?

প্রায় ঘন্টা খানেক হতে চলল উমা ও অয়ন একই জায়গায় বসে। কথা কিন্তু বিশেষ হয়নি। ওই যেটুকু বললাম, ওটুকুই। ফলস্রতু, উমার শেষ বাক্যটি।

- বস না। কতদিন পরে কথা হলো আমাদের বল তো।

- হ্যাঁঃ। তা যা বললি। ফাইনালি হলো।

- ...... এরপর?

- জানি না।

- আবার সব কিছু শুরু থেকে শুরু করা যায় না, উমা?

- যায় হয়তো। অবশ্যই যায়। আমরা নিজেদের দোষে একটা বোকামি করেছিলাম, তার শাস্তিও পেয়েছি- ছটা মাস আলাদা থেকে কষ্ট পেয়ে, ভগবান আমাদের চরমভাবেই শাস্তি দিয়েছে।

এটা শুনেই অয়ন হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রার্থনা করার ভঙ্গিতে কিছু বলে উঠে, পকেট থেকে কি একটা নিয়ে মুঠোবন্দি করে, হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো উমার সামনে।

মুঠোটা খুলে একটা ছোট্ট রডোডেনড্রন ফুল উমার দিকে তাক করে বলতে লাগল...

- উমা। ভালোবাসি তোকে। সেই যেদিন প্রথম দেখেছিলাম হাওড়াগামী ট্রেনে, সেদিন থেকে আজ ওব্দি, এক মুহুর্তের জন্যেও ভালোবাসাটা কমেনি কোনোদিন, শুধু বেড়েছে। ছয় মাস আলাদা থেকেও আমাদের মন কিন্তু আলাদা ছিল না! তারা একে অন্যের খোঁজ, খেয়াল সমানে রেখে গেছে। এই দেবভূমিতে আমরা আমাদের কাঁচা, ভঙ্গুর এই ভালোবাসাটাকে একটা পাকাপোক্ত রূপ দিতে কি পারি না?

উমার চোখে আবার সেই চেনা বরফকণা। সে কাঁপা, ভাঙা গলায়, বলে ওঠে,

- কিভাবে?

- আজীবন তোর সাথে শুধু বসন্তের পলাশ নয়, ভয়াবহ এই শীতের কুয়াশাও ভাগ করে নিতে প্রস্তুত আমি। তুই পারবি তো?
উমা, Will You Marry Me?

উমা কিছু বলে উঠতে পারে না আর। বরফকণা সব বাঁধ ভেঙে হিমবাহ গলার মতো বইছে তার গাল বেয়ে, কান্না হয়ে। দূর তাঁবু থেকে ওই কি একটা আওয়াজ শুনতে পায় উমা। আকাশের নক্ষত্রগুলোও যেন কিছু বলে ওঠে। বোঝে না উমা তা কি! তার গোটা পৃথিবীটাকেই এখন খুব সাধারণ মনে হচ্ছে। কেবল অয়নকে বাদ দিয়ে।

সে অয়নেকে হাত ধড়ে উঠিয়ে, জড়িয়ে ধরে।

- না রে। শুধু কুয়াশা নয়; তুই পাশে থাকলে তুষারঝড় আসুক, বা মরুঝড়, সব সামলাতে তৈরি। Yes!

ইন্দ্র, রাপূর্ণা, অগ্নিরা ছুটে এসে ওদের জড়িয়ে ধরে। ওরা যেন আগাম অপেক্ষায় ছিল, এমন কিছু হওয়ার।

এই দূরদেশে, দুটো সদ্য যৌবনে পা রাখা ছেলে-মেয়ের হাত ধরে, আবহাওয়া বা ক্যালেন্ডারের তোয়াক্কা না করেই বসন্ত এবারে নিজের অজান্তে, সময়ের অনেক আগে চলে আসল...!

......


কিছুক্ষণ পরে হুল্লোড় থামলে ইন্দ্র অয়নের কানে কানে বলে ওঠে;

- কি হে স্যার! বলেছিলাম মাঠে খেলতে নামতে, তুই তো পুরো ট্রফি সাথে নিয়ে চলে আসলি।

- এবার তোকে খেলাব দাঁড়া। তোর দ্বারা তো আর কিছু হবে না, রাপূর্ণা কে আমরাই বলব আজ।

পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল উমা ও অগ্নি। উমা হাসতে হাসতে বলে ওঠে,

- কি বীরশ্রেষ্ঠ। আহা! ছয় মাস ধরে যিনি কিছু বলতে পারেননি সে অন্যর হয়ে বলবে। ইন্দ্র, চুপচাপ চল। তুই-ই বলবি, আর আমরা একসাথে চারজন বিয়ের পিড়িতে বসব। চল এবার।

- হ্যাঁ। আমি বন্ধুদান করব সব। কত দায়িত্ব। চারজনের একসাথে বিয়ে... আহা।

- নাহ! তাড়াতাড়ি পা চালা ইন্দ্র। আমার হবু বউয়ের অর্ডার। কথা না শুনলে আবার আমার বিয়েটা যদি ভেস্তে যায়... এই না। না। খুব চাপ...

পায় পায় ওরা সবাই এগিয়ে চলে রাপূর্ণার দিকে......।


আগেই বলেছি - দেবভূমীতে এই প্রথমবার শীতের যাওয়ার অপেক্ষা না করেই, একটা রডোডেনড্রনকে সঙ্গী করে বসন্ত এসে পড়েছে সবার মাঝে।

শীত শেষের সকল রুক্ষতা কে সারিয়ে, জীবনকে আবার নতুন রঙে রাঙানোর জন্য, ভালোবাসাকে, ভালোবাসাদের বাঁচিয়ে রাখতে, বসন্তকে তো আসতেই হবে !

তার আসতে হয়তো দেরী হতে পারে, তবে ভালোবাসাটা যদি খাঁটি থাকে, বসন্ত কিন্তু আসবেই। হয়তো অয়ন-উমাদের জীবনের মতো করেই ; আকষ্মিক।

আর জীবনকে এক্কেবারে রাঙিয়ে দিয়ে যাবে অপ্রত্যাশিতভাবে। তুমি যতোটা ভেবে রেখেছ, তার থেকেও হয়তো কয়েকগুন বেশি সুন্দর করে, কয়েকগুন বেশি রঙিন ভাবে.......!

অয়ন, উমা, এবং বাকিদের, এই শীত-বসন্তের মরশুমে আমরা আর ধাওয়া করব না। ফেলে আসা কুয়াশা আর ভালোবাসাকে সাক্ষী রেখে, ওরা সমারোহে এগিয়ে যাক পূর্ণতার দিকে, বলা ভালো ; জীবনের দিকে.....।

(কলকাতার সরু গলি, মৃত মানুষদের হাসি, ছোট্ট রডোডেনড্রন, ও ভালোবাসার অনুভূতি বাদে, এই গল্পের সব কিছুই কাল্পনিক)

I Owe You A December

For those, Who still silently cries alone in the bed, when all the switches go off– May you find your light soon, and for foreve...