"এক অজনবী হসীনা সে,
য়ূ মুলাকাত হো গযী....."
ফেরিঘাট লাগোয়া কোনো এক চায়ের দোকানের রেডিও থেকে ভেসে আসতে লাগল কিশোর কুমারের সেই অমোঘ, কালজয়ী কন্ঠস্বর। আজও এইসব গান শুনলে এক আলাদা অনুভূতি বয়ে যায় সারা শরীর দিয়ে। এখন আমরা যতই টেলর সুইফ্ট বা অরিজিৎ সিং কে নিয়ে মেতে থাকিনা কেন, কিশোর কুমার আজও আট থেকে আশি, সকলের হ্রদয়ের গভীরে; কোনো বিশেষ একটি কোষে স্থান করেন, এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, চিরকালই করবেন।
গত এক সপ্তাহের দাবদাহ শেষে আজ সারা শহর মেঘে ঢেকেছে। জোরদার একটা বৃষ্টি হবে বলে মনে হচ্ছে। আগে বর্ষাকালে এত গরম ভাবাই যেত না। এখন প্রকৃতি নিজের বানানো নিয়মকানুন নিজেই মানতে চায়না। আচ্ছা, জুন মাসে এরকম হঠাৎ ঝড় উঠলে, সেটাকে 'কালবৈশাখী' বলা যায় কি? বহুদিন হয়ে গেল, শহরে আর কালবৈশাখী দেখা যায়না।
প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে ফেরিঘাটের রাস্তাটায় পায়চারি করছে অর্ঘ্য। ঠিক বিকেল সাড়ে ৩টে-তে যার সাথে দেখা করার কথা ছিল, তিনি "আর পাঁচ মিনিট" বলে কাটিয়ে দিয়েছেন গোটা একটা ঘন্টা। অর্ঘ্য অবশ্য এমনটা হতে পারে আন্দাজ করে নিজেই এসেছে আধ ঘন্টা পরে। আরও যে বেশ কিছুক্ষণ এরম মশার কামর, এবং উদ্দেশ্যহীন পায়চারি করে কাটাতে হবে তা অর্ঘ্য বিলক্ষণ জানে।
অর্ঘ্যর সঙ্গী এখন তাই মাটির এক ভাড় চা, রেডিওয়ে চলা কিশোর কুমার, এবং স্মৃতির খাতায় পড়ে থাকা কিছু রঙিন অধ্যায়...।
মাফ করবেন, এটি দুনম্বর চা। চা-টা আসলে হেব্বি বানিয়েছে, তাই আর কি। আগের ভাড়টা কয়েক মিনিট আগেই ডাস্টবিনে গেছে। এখনও দেখা যাচ্ছে সেটি......।
২
(বছর দশেক আগে)
বাইরের আবহাওয়ার মতনই 'চন্দননগর হাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল'-এর ভেতরেও এই মুহুর্তে এক অদ্ভুত গুমোট পরিবেশ। একধরনের চাপা কষ্ট কোথাও যেন গ্রাস করেছে সকলকে।
২০১৩-১৪ ব্যাচের ফেয়ারওয়েল চলছে স্কুল অডিটোরিয়ামে। এই স্কুলের নিয়মকানুন অন্যান্যদের থেকে একটু আলাদা। টুয়েলভের বোর্ড পরীক্ষা হয় যাওয়ার পর, রেসাল্ট বেরোলে তবে এখানে ছাত্রছাত্রীদের ফেয়ারওয়েল দেওয়া হয়। এক হাতে থাকে টুয়েলভের মার্কশিট ও আরেক হাতে মিষ্টির প্যাকেট এবং মেমেন্টো। সাথে সারা জামা জুড়ে বন্ধু এবং টিচারদের বিদায়ী বার্তা। যদিও বন্ধুদের বার্তাগুলো সবসময় বিদায় সংক্রান্ত হয়না... যাকগে সেসব কথা।
সংস্কৃতি অনুষ্ঠান শেষের পথে। মানে ঘড়ির কাঁটায় আর নির্দিষ্ট কয়েক মিনিট। তারপরেই এই অডিটোরিয়ামে বসা শ'খানেক ছেলেমেয়ের স্কুল জীবন সরকারি ভাবে শেষ। কারোর পনেরো, কারোর বারো, কারোর আবার পাঁচ তো কারওর আবার দুই বছরের সম্পর্ক, আজ সবকিছুর সমাপ্তি।
অর্ঘ্যর গায়ে কনুই দিয়ে একটা খোঁচা মারল রায়ান।
"উফ! কি হলো?"
"আরে, কি হলো মানে? দেখছিস না, অনুষ্ঠান প্রায় শেষ। আর বোধহয় একটা গান, একটা বকবক, ব্যাস। অপেক্ষা করে থাক তুই পরের জন্মের জন্য।"
"আস্তে রায়ান... ও সামনেই আছে।"
ঠিকই তো।
সে যে সামনেই আছে।
অর্ঘ্যর দুটো বেঞ্চ পরেই বসে আছে টুয়েলভ 'এ'-র রাই সেন।
রাই যেমন অসাধারণ ছাত্রী, ঠিক তেমনই সুন্দর গান গায়। তার কন্ঠে এক অদ্ভুত মিষ্টি গাম্ভীর্য আছে, যা তার গায়কী এবং কথাবার্তা দুইয়েতেই প্রকাশ পায়। হায়ার সেকেন্ডারি তে তাই নায়েন্টি পার্সেন্ট ও জয়েন্টে সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ পেয়েও সে উচ্চশিক্ষার জন্যে বেছে নিয়েছে নিজের প্যাশন, মিউজিককে।
এই রাইয়ের ওপরেই গত দুই বছর ধরে মন পড়ে আছে চন্দননগর হাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অর্ঘ্যজিত চক্রবর্তীর, অর্থাৎ আমাদের অর্ঘ্যের।
অর্ঘ্য ওদের ব্যাচের অন্যতম প্রতিশ্রুতিমান ছাত্র। প্রথম চেষ্টাতেই সে মেডিক্যালের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। লিওনেল মেসির অন্ধভক্ত অর্ঘ্য স্কুল ফুটবলে প্রচুর গোল করেছে এবং করিয়েছে।
তবে ক্লাস ইলেভেনে এই স্কুলে নতুন ভর্তি হওয়ার পর দ্বিতীয় দিনে স্কুলে রাই নামক মেয়েটিকে দেখেই অর্ঘ্য বুঝে গেছিল যে তার যাবতীয় ডিফেন্স ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষ প্রথম মিনিটেই গোল দিয়ে দিয়েছে।
যদিও ম্যাচ তখন সবে শুরু হয়েছে, কিন্তু রাজ্যস্তরে খেলা পোড় খাওয়া ফুটবলার অর্ঘ্যজিত চক্রবর্তী জানত, যে এই ম্যাচটার ফলাফল পূর্বনির্ধারিত.....।
ফিক্সিংটা করল কে?
ডাইরেক্ট ভগবান নাকি.....?
৩
ক্লাস ইলেভেনে প্রথম এই স্কলে আসার পরে অর্ঘ্য প্রায় কাউকেই চিনত না। এমনিতেই সে স্বল্পভাষী এবং লাজুক প্রকৃতির, কাজেই বন্ধু পেতে তাকে বেশ ভালই বেগ পেতে হয়েছিল।
আর তার নতুন স্কুলে প্রথম বন্ধু পাওয়ার ঘটনাটাও বেশ মজার।
চলুন, তাহলে যাওয়া যাক আরও বছর দুইয়েক পিছনে.........
ইলেভেনের দ্বিতীয় দিনেই বিচ্ছিরি রকমের দেরী হয়ে গেল অর্ঘ্যর। সকাল থেকেই আকশ কালো করছে দেখে সে ভেবে রেখেছিল স্কুলে যাবেনা, তবে আজ প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস আছে। প্রথম ক্লাসটাই মিস করা ঠিক হবেনা ভেবে, দেরী সত্বেও সে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
অর্ঘ্য ক্লাসে ঢোকার আগেই কেমিস্ট্রি শিক্ষক অগ্নিহোত্রী স্যার ক্লাসে এসে পড়েলেন। প্র্যাক্টিক্যালের জন্য সমস্ত পড়ুয়াদের দুজন-দুজন করে গ্রুপবিন্যাস করে দিলেন তিনি।
একা পড়ে রইল নতুন অ্যাডমিশন নেওয়া রাই। তাকে একাই যেতে হলো ল্যাবে।
ইতিমধ্যেই স্কুলে পৌছালেও আট মিনিট দেরী করার মতো চরম অপরাধে অর্ঘ্য একশজন কে হাজারখানেক কৈফিয়ত দেওয়ার পর যখন ক্লাস থেকে ল্যাবে ঢুকলো, তখন সে পাক্কা পনেরো মিনিট লেট।
তাকে দেখামাত্রই অগ্নিহোত্রী স্যার রসায়ন ছেড়ে বাংলার শিক্ষক হয়ে গেলেন, এবং প্রায় তিন মিনিটের দীর্ঘ বক্তৃতায় প্রাইমারি ক্লাস থেকে পড়া 'ছাত্রজীবনে ডিসিপ্লিনের প্রয়োজনীয়তা' রচনার মূল বিষয়গুলি সম্পর্কে অর্ঘ্যকে গভীর ভাবে অবহিত করতে থাকলেন।
তবে এর থেকেও ভালো কাজটা তিনি করলেন বক্তৃতা পর্ব মেটার পরে, যা না হলে হয়তো আজ এই গল্পটাই শুরু হতো না।
হ্যাঁ। একদম ঠিক ধরেছেন।
অগ্নিহোত্রী স্যার রাইয়ের "প্র্যাক্টিক্যাল" পার্টনার হিসাবে জুড়ে দিলেন অর্ঘ্যকে।
এদিকে ক্লাস তো অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। স্যারও সবাইকে কি করে কি করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন এবং সবাই সেই অনুযায়ী এক্সপেরিমেন্ট শুরু করে দিয়েছে।
অর্ঘ্য এসবের মাঝে ভীষন রকম ভাবে ধাঁধিয়ে গেছে। কিচ্ছু বুঝতে পারছেনা যে কি করবে। প্রচন্ডরকমের লাজুক ও ইন্ট্রোভার্ট হওয়ায় কাউকে কিছু জিগ্যেসটুকুও সে করতে পারছেনা।
রাই অর্ঘ্যর সমস্যাগুলো বুঝতে পারল। সে অর্ঘ্যর মতো চুপচাপ, মুখচোরা নয়; সহজেই মানুষের সাথে মিশে যেতে পারে। রাই তাই নিজে থেকেই অর্ঘ্যকে খুব যত্ন নিয়ে প্র্যাক্টিক্যালের খুটিনাটি বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিতে লাগল।
প্রথমবার এই স্কুলে কারও সাথে কথা বলল অর্ঘ্য।
তবে শুধু কথাতেই থেমে থাকলে তো আর কোনো সমস্যাই থাকত না...
জানালার পাশে থাকা ডিস্টিল্ড ওয়াটারের বোতলটা অর্ঘ্যকে দিতে বলল রাই। অর্ঘ্য সেটা আনতে গিয়ে খেয়াল করল সকালের সেই কালো মেঘটা এখন আরো ঘন হয়েছে, হাওয়াও বেশ দিচ্ছে। যেকোনো মুহুর্তে জোরদার বৃষ্টি শুরু হবে।
রাইকে বোতলটা দিতে গিয়ে প্রথমবার তাকে ভাল করে দেখল অর্ঘ্য। তার চোখ আটকে গেল রাইয়ের চোখে। এক অসম্ভব সুন্দর মায়া আছে তার দৃষ্টিতে। যা একইসঙ্গে স্নিগ্ধ এবং চঞ্চল। শান্ত এবং দৃঢ়। অর্ঘ্যর মনে হতে লাগল যেন পৃথিবীর সমস্ত ঘড়ির সময় থমকে গেছে, শুধুমাত্র সে যাতে রাই কে দেখতে পারে তার জন্য। তার মনে হতে লাগলো যেন কোনো রাজকন্যা সাক্ষাৎ তার সামনে দাড়িয়ে আছে।
অর্ঘ্যর মনের ভিতরের মত ঝড় এখন উঠেছে বাইরেও। আর সেই ঝড়ের হাওয়ায় রাইয়ের ছোট্ট করে বাঁধা চুল বারবার তার কপালের সীমানা পেড়িয়ে চলে আসছে চোখের কাছে এবং রাই ব্যাস্ত হয়ে পড়ছে তাদের সামলাতে।
অর্ঘ্যর মনে হচ্ছে ছোট থেকে শোনা কেকে-র সব গানগুলো কেউ যেন এক সাথে চালিয়ে দিয়েছে তার মনের ভিতরে...।
অর্ঘ্যর নিজের কাছেই এমন অনুভূতিগুলো তাকে খুব অবাক করল। এত বছরের জীবনে 'ভালোবাসা' শব্দটার মানে বোঝার সৌভাগ্য তো আসলে তার আগে হয়নি।
সে এখন শুধুই এটুকুই ভাবছে যে 'রাই'য়ের নামকরণটি কতখানি সার্থক।
আরে, কি হলো? বুঝলেন না?
রাই তো আসলে ভগবান রাধারানীর আরেক নাম।
ততক্ষণে শহরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে.....।
৪
এরপরে যত দিন গড়িয়েছে, আমাদের গল্পের দুই চরিত্রই নিজগুনে সারা স্কুলজুড়ে পরিচয় পেয়েছে। দুজনেরই বন্ধু এবং চেনা-পরিচিতের সংখ্যাও বেড়েছে।
আর সাথে সাথে গাঢ় হয়েছে তাদের নিজেদের বন্ধুত্ব। বন্ধু থেকে এখন তারা বেস্টফ্রেন্ড।
এবং,
এবং এসবের সঙ্গেই প্রত্যেকটি দিনশেষে বেড়েছে রাইয়ের প্রতি অর্ঘ্যর গোপন ভালোবাসার অনুভূতি।
হ্যাঁ। এতদিনে অর্ঘ্য এটুকু বুঝে গেছে যে এটাকেই ভালবাসা বলে। আর এটাও উপলব্ধি করেছে যে বন্ধুত্বে ভালোবাসার ছন্দ আসতে চাওয়া মানেই তা মন ভাঙার অশনি সংকেত। বন্ধু বিদায়ের অকাল কুডাক।
ইলেভেনটা এভাবেই চলল। রাই এবং অর্ঘ্য দুজনেই চুঁচুড়ায়ে থাকলেও তাদের বাড়ি অনেকটাই দুরে। রাইয়ের বাড়ি চুঁচুড়া স্টেশনের কাছে তো অর্ঘ্যর হুগলি স্টেশনে।
তবে একই রুট হওয়ায় দুজনে স্কুল থেকে একসাথেই বাড়ি ফেরে।
আর যাওয়ার সময় অর্ঘ্য ট্রেনে ওঠে হুগলি স্টেশন থেকে। রাই ওঠে ঠিক তার পরের স্টেশন চুঁচুড়া থেকে। অফিস টাইমের ভীড়ে ঠাসা ট্রেনে চুঁচুড়া স্টেশন এর প্ল্যাটফর্ম দেখতে পেলেই আমাদের গল্পের নায়কের মনে উথালপাতাল শুরু হয়ে যায়। একে ওক ঠেলে, পাঁচটা লোকের কাছে কথা, দুটো লোকের কাছে গালি শুনেও সে যে কোনোভাবেই হোক পৌঁছে যায় দরজা বা জানালার একদম কাছে।
একঝলক হলেও যাতে সে রাই কে দেখতে পারে তার জন্য.....।
অর্ঘ্যর উচ্চতা প্রায় পাঁচ' আট। সুদর্শন, সুঠাম চেহারা, চোখে চশমা , সদ্য ওঠা দাড়ি, চুপচাপ থাকলেও সবমিলিয়ে বেশ সম্ভ্রম জাগানো এক ব্যক্তিত্ব তার। মেয়েরা অনেকেই তার দিকে তাকালেও, সে চিরকালই এসব বিষয়ে উদাসীন ছিল। তার লক্ষ্য ছিল একমাত্র নিজের জীবন ও ক্যারিয়ার এবং ফুটবল।
জীবনের লক্ষ্যটা ঠিক থাকলেও, সেই উদাসীনতা যে কোথায় হারিয়ে গিয়ে কিভাবে এমন ভালোবাসায় বদলে গেল ভাবতে গেলেই হেসে ফেলে অর্ঘ্য।
দুটো বছর যেন চোখের নিমেষেই কেটে গেল। স্ট্র্যান্ডে একসাথে ঘুরতে যাওয়া থেকে এমপি থ্রি প্লেয়ারের একটাই হেডফোনে এলভিস প্রেসলি, উদিত নারায়ন বা শ্রেয়া ঘোষাল শোনা, একসাথে বসে ফুচকা, চুরমুর বা পেয়ারা মাখা খাওয়া, ফেরার পথে কারও সাইকেল নিয়ে ফেরা; আর বৃষ্টি পড়লে দুজনে ভিজতে ভিজতে হেঁটে এসে ট্রেন মিস করা....
সব কিছু যেন খুব তাড়াতাড়ি ঘটে গেল।
আর এই দুই বছরের প্রত্যেকটা দিন অর্ঘ্য দক্ষ অভিনেতার মত অভিনয় করে গেছে রাইয়ের কাছে তার ভালোবাসা প্রকাশ না করার। তাতে সে চুড়ান্ত সফল। রায়ান, যে কিনা তার প্রাণের বন্ধু, তাকে ছাড়া আজ ওব্দি কাউকে জানায়নি এ বিষয়ে। রায়ান কথাটা শুনে এতটাই অবাক এবং অর্ঘ্যর ওপরে অভিমান করেছিল যে গোটা একদিন কথা বলেনি তার সাথে। তবে তারপর সব সময়ই সে অর্ঘ্যকে সু-পরামর্শ থেকে সাইকেল, অনেক কিছু দিয়েই অর্ঘ্যকে সাহায্য করেছে।
টুয়েলভের শেষ পরীক্ষার দিন অনেক চেষ্টা করেও অর্ঘ্য রাইকে বলতে পারেনি তার মনের কথা। কিভাবে যেন সব গুলিয়ে গেছিল। এক বিশাল অজানা ভয় তাকে আকড়ে ধরছিল পরীক্ষার পর রাইকে দেখলেই। কথা বলতে পারছিল না অর্ঘ্য।
যে এই অনুভূতিটাকে অনুভব করেছে, সে জানে। এটা কিন্তু প্রত্যাখ্যানের ভয় না।
এটা হারিয়ে যাওয়ার ভয়। প্রিয় মানুষটার কাছ থেকে।
এটা হারিয়ে ফেলার ভয়। প্রিয় মানুষটাকে।
৫
(কাট্ টু ফেয়ারওয়েলের দিন)
"কিরে, আজ প্র্যাকটিস রাখিসনি তো?"
অর্ঘ্যর স্কুলের জামায় সই করতে করতে জিগ্যেস করল রাই।
ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে প্রায় মিনিট দশেক আগে। অর্ঘ্য, রাই-রা এখন সরকারি ভাবে এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী। সবাই একে অন্যের জামায় বিদায়ী বার্তা লিখে সই করছে।
সবার মুখে মুখে একটাই কথা, "দেখা করতে থাকতে হবে কিন্তু, প্রতি সপ্তাহে...."
ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় প্রত্যেকটা বছরই এই কথাগুলো যখন ক্লাসের বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ড, চক, ডাস্টার বা দেওয়ালেগুলো শোনে, ওরা নিজেদের মধ্যে ভীষণ হাসাহাসি করে হয়তো। একে অপরকে ওরা বলে হয়তো "দেখ দেখ, এরা বলছে প্রতি সপ্তাহে দেখা করবে, হাহা, এতদিন জীবনটা যাদের সাথে কাটালো, তাদের আর্ধেককে জীবনে হয়তো আর কোনোদিন দেখতে পযর্ন্ত পাবে না....." যাকগে সেসব কথা।
"নাহ্। তুই বলেছিস যখন, তখন তো ছুটি নিতেই হবে।"
রাইকে উত্তর দেয় অর্ঘ্য।
"আর কিছু ভেবেছিস কোথায় যাবি?"
"ইয়েসস্! বাট এখন কিচ্ছু বলব না। রায়ান চুঁচুড়া স্টেশনের পার্কিংয়ে ওর সাইকেলটা রেখে দিয়েছে। ওটাই আজকের বাহন।"
"বেশ ভালো।"
সবার শেষে, স্কুল থেকে বেরোনোর ঠিক আগে রায়ানের জামায় সই করলো অর্ঘ্য। চোখে জল এসেছিল দুজনেরই। রায়ানই সামনে নিল।
"কাঁদিস না। বাকিদের কথা জানিনা, আমাদের দেখা হবে, কথা হবে এইটুকু শিওর। কালই তোর বাড়িতে গিয়ে গ্যাজাবো দেখিস। তবে আজ আর দেরী করিস না। আজ কিন্তু তোর লাইফের বিগ্ ডে, দয়া করে ক্যেঁচাশ না। অল্ দ্যা বেস্ট! বিজয়ী ভবঃ"
..........
ট্রেন থেকে হঠাৎই কাশফুল দেখতে পেল রাই। ভরা বর্ষায় কাশফুল দেখতে পেয়ে একই সঙ্গে অবাক এবং উত্তেজিত হলো রাই।
"দেখ বর্ষাকালে তোকে কাশফুল পর্যন্ত দেখিয়ে দিলাম, এবার তো বল কোথায় যাচ্ছি?" সদ্য কেনা ডালমুট খেতে খেতে প্রশ্ন করে রাই।
"আরে চাপ নিচ্ছিস কেন? তোকে কিডন্যাপ থোড়াই না করবো... দেখতেই পাবি।"
"ধ্যাররর।"
এইসব টুকটাক কথাবার্তার মধ্যেই চুঁচুড়ায় ট্রেন দাড়ালে নেমে পড়ল ওরা।
"দু-মিনিট দাড়া। রায়ানের সাইকেলটা নিয়ে আসি।" রাইয়ের উত্তরের অপেক্ষা না করেই চলে গেল অর্ঘ্য।
ফিরল ঠিক পাঁচ মিনিট পর।
"চল। উঠে পর জলদি। ফেরিঘাট যাব।"
"এখন ফেরিঘাটে গিয়ে কি করবি?"
"আরে ওঠতো আগে।"
রাইকে ক্যারিয়ারে বসিয়ে সাইকেল চলতে থাকল চুঁচুড়া ফেরিঘাটের দিকে।
"নেমে দাড়া। সাইকেলটা রেখে টিকিট কেটে আসছি।"
"মানে ওপাড়ে যাবি নাকি?? ফিরতে তো অনেক দেরী হয়ে যাবে।"
"আরে ভাই, একদিন হলো নাহয় একটু দেরী, আবার কবে দেখা হবে কেউ জানিনা, চল না..."
টিকিট কেটে লঞ্চে ওঠার লাইনে দাড়ালো ওরা।
বিকেলের আকাশ এই মুহুর্তে নিজেকে রাঙিয়ে তুলতে ব্যাস্ত। আরে বর্ষাকাল বলে তার কি একটু সাজতে ইচ্ছে হয়না? তাই সে এখন কোনো ভীষন প্রতিভাবান এক শিল্পীকে দিয়ে তার বিশাল ক্যানভাস রঙ করাতে ব্যাস্ত। মেঘ ছোট ভাইয়ের মতন প্রচণ্ড চেষ্টা করছে তাকে জ্বালানোর, তবে আজ সে বারবার ব্যার্থ হচ্ছে।
বেশ জোরে একটা সাইরেন বাজিয়ে লঞ্চটা ছাড়ল.....।
৬
"আকাশটা কি দারুণ লাগছেরে অর্ঘ্য! আর হাওয়াটাও সেরমই দিচ্ছে। না আসলে সত্যিই মিস করতাম এগুলো।"
"যাক, কিডন্যাপিং-এর অপবাদটা ঘুচল তাহলে বোধহয়। ওপারে চল, দেখবি আরো ভালো লাগবে।"
"ওপারে কি আছে আবার? বল বল, জলদি বল।"
"জলদিকা কাম শ্যায়তান কা হোতা হ্যায়। শুনেছিস তো প্রবাদটা। কাজেই দু-মিনিট কষ্ট করে একটু ধৈর্য্য ধর, সব উত্তর পেয়ে যাবি।"
"এরম থাকলে জীবনে মেয়ে জুটবে না আর তোর কপালে।"
শেষ বাক্যটা শুনে হাসল অর্ঘ্য। বুকপকেটে রাখা গোলাপফুলটায়ে একবার হাত দিয়ে দেখে নিল ঠিক আছে কিনা। হ্যাঁ। ভিড়েও সেটা অক্ষতই আছে।
গোধূলিবেলা গায়ে মেখে এগিয়ে চলে অর্ঘ্য ও রাইদের লঞ্চ।
.............
"দেখে, সাবধানে নাম।"
"উফফফ! কত বছর পরে লঞ্চে উঠলাম রে ভাই। সেই কোন ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে একটা মেলায় এসেছিলাম, তারপর আবার আজ।"
"বুঝলাম, চল আগে এক কাপ করে চা খাই, নাহলে এত ভাল দিনটার আবেগ ঠিক ফুটে উঠবেনা।"
"চল তাহলে, সামনেই দেখতে পাচ্ছি একটা দোকান আছে।"
দুজনে দুই ভাড় চা নিয়ে বসল ফেরিঘাটের পাশের ঘাটের সিড়িতে।
"আহ্! কি ভালো চা-টা বানিয়েছেরে রাই। আরেক কাপ খেলে হয়... আর দুটো কাপ নিয়ে আসি? দুজনের?"
"বসতো চুপচাপ। চাখোড় কোথাকার।"
বেচারা অর্ঘ্য ভেবেছিল তার মনের ভিতরে যে তীব্র উত্তেজনা আর বুকের ভিতরে যে ভীষন ধরফরানিটা হচ্ছে, সেটা কমাবে চা খেয়ে, সে গুড়ে বালি পড়ে গেল।
"আরে ভুলেই গেছিলাম। আজ তো বাড়ি থেকে মোবাইলটা এনেছি। দাড়া চটপট একটা ছবি তুলি, পরে ফিরে তোকে পাঠিয়ে দেব। ওকে?"
কথাগুলো বলে অর্ঘ্যর উত্তরের অপেক্ষায় না থেকেই নিজেদের একের পর এক সেলফি তুলে যায় রাই।
অর্ঘ্য বুঝতে পারছেনা কিভাবে আর কি করে সে তার মনের কথাগুলো বলবে রাইকে। সব কিছু মনে হচ্ছে গুলিয়ে যাচ্ছে। চেনা সেই ভয়টাও আবার যেন ফিরে ফিরে আসছে।
এদিকে ঘড়ির কাটাও থেমে নেই।
"রাই, এখানে একটা দারুন জিনিস পাওয়া যায়। চল যাই, একদম কাছেই দোকানটা।"
"আচ্ছা। বলছিস যখন যাই।"
অর্ঘ্য মনে মনে মোটামুটি একটা চিত্রনাট্য তৈরি করে নিল। দোকানটা থেকে বেরিয়েই লঞ্চের দিকে যাওয়ার পথেই সে যা কিছু তার বলার আছে সব বলে দেবে রাইকে।
অর্ঘ্য রাইকে নিয়ে গেল এক ছোট্ট টিনের চালা দেওয়া দোকানে। একটা ভিড় ছিল দোকানটা ঘিরে, তবে সেটা এখন পাতলা হচ্ছে। এক বয়স্ক ভদ্রলোক সাদা পাঞ্জাবী ও ধুতি পড়ে দোকানটির দায়িত্বে আছেন। দোকনটির বাহির ও অন্দরসজ্জার সাথে যে দোকানির বেশ মানানসই নয়, তা বলাই বাহুল্য।
দোকানের ভিতর থেকে দুটো ভাড় নিয়ে বেরিয়ে এল অর্ঘ্য।
"এটা কি?"
"এটা হলো মটকা কুলফি। ভাড়ের ভিতরে কুলফি। এটার সন্ধানও রায়ানেরই দেওয়া। বলছিল নাকি দারুন খেতে। জানিনা এবার। এখানে এসে আমিও তোর মতনই অবাক। আরেকটি অদ্ভুত জিনিস শুনলাম জানিস..."
"কি?"
"এই মটকা কুলফি খেতে যে একবার আসে, তাকে আরেকবার ফিরতেই হয়। আজ ওব্দি নাকি এর অন্যথা হয়নি।"
"এটা কিন্তু হেব্বি মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি কিন্তু যাই বলিস। কেমন একটা গা ছমছম করে শুনলে। তাও আবার সন্ধ্যাবেলায়।"
"তা যা বলেছিস।"
বেলাশেষের গঙ্গাকে পাশে রেখে হাটতে থাকে ওরা।
"খেতে কিন্তু অসাধারন অর্ঘ্য এটা। আমি এত ভাল কুলফি এর আগে খেয়েছিলাম একবার পুরীতে, এটা ওটার থেকেও ভাল।"
"হুম ঠিকই।"
অর্ঘ্য কিন্তু কিছুতেই আর এখন স্বাদ পাচ্ছেনা। লঞ্চঘাটটা তার মনে হচ্ছে যেন দৌড়ে দৌড়ে এগিয়ে আসছে, তার সময় কমানোর জন্য।
সে পারছেনা। বহু চেষ্টাতেও পারছেনা। এক ভয়ঙ্কর ভয় তাকে যেন গ্রাস করে নিচ্ছে বারবার, যখনই সে একটু স্থির হয়ে চেষ্টা করছে বলতে যাওয়ার, সেই ভয়টা আরও বেশি করে তাকে ঘিরে ধরছে। তাকে গিলে নিচ্ছে।
অর্ঘ্য পারল না।
সে বহুবারের চেষ্টাতেও একটা মনের কথাও রাইয়ের কাছে বলতে পারলনা। প্রথমবার বোধহয় জীবনে কোনো পরীক্ষায় অর্ঘ্য ফেল করল। তাও এতটা বাজে ভাবে।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয় বিজ্ঞানীরা দুটো শব্দের উপর গবেষণা করতে পারে। ভালোবাসা এবং বন্ধুত্ব। বড়ই অদ্ভুত লাগে এই শব্দদুটোকে আমার। বানান বা উচ্চারণ কোনোটাই তেমন কঠিন নয়, তবু এদের আসল মানে আজ ওব্দি কেউ ঠিক করে খুঁজে পেল না। বিজ্ঞানীরা কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে পারেন। চেষ্টা করতে পারেন শব্দদুটির পারস্পরিক সম্পর্কের ইকুয়েশনটা কোনোভাবে মেলানোর।
পৃথিবীর হাজার হাজার অর্ঘ্যরা তবে ভাল থাকতে পারে।
লঞ্চ যখন ফের চুঁচুড়া ঘাটের সামনে থামতে চলেছে রাই কিছু একটা গুনগুন করতে থাকল। কোনো গান কি? হ্যাঁ, শুনতে পারছে অর্ঘ্য।
"আরো একবার চলো ফিরে যাই,
পাহাড়ের ওই বুকেতে দাঁড়াই
আকাশের হাতছানিতে সাড়া দিই
কি হবে না ভেবে।"
আস্তে গাওয়া হলেও কি গানের লাইনগুলো ছুঁয়ে যেতে পারল রঙচঙে আকাশের কোনো এক মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইশ্বর নামক কাউকে........?
৭
(দশ বছর পরে; এখন)
নমস্কার। ডঃ অর্ঘ্যজিত চক্রবর্তী বলছি। অর্থাৎ এই গল্পের অর্ঘ্য। এতক্ষণ আমার জীবনের একটা অংশের গল্প আপনারা জানলেন। বাকি এখনও একটা ছোট্ট অংশ। ইমতিয়াজ্ আলীর তামাশায় ছবিতে রনবীর কপুর কে দেখার পর থেকে দেশের সমগ্র যুবসমাজ যদি নিজের গল্প নিজে লিখতে চায়, আমি কেন অযথা ব্যাতিক্রম হতে যাব? কাজেই এই গল্পের শেষটুকু, আমি নিজেই লিখছি।
সেই ফেরিঘাটে বসেই।
টুয়েলভের ফেয়ারওয়েলের মাসখানেকের মধ্যে আমি চলে যাই দেহরাদুনে এম.বি.বি.এস পড়তে। রাই মিউজিক নিয়ে চান্স পেয়েছিল বিশ্বভারতীতে, আর রায়ান পেয়েছিল যাদবপুরে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং। প্রথম প্রথম স্মার্টফোনের দৌলতে প্রায় সবার সাথেই অল্পবিস্তর যোগাযোগ থাকলেও সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ তা ফিকে হতে থাকে।
যোগাযোগটা সেই আগের মতনই থেকে গেছিল শুধু রায়ানের সাথে।
পড়াশোনা মোটামুটি ভালই করছিলাম। এম.বি.বি.এসের লাস্ট ইয়ারে আমি গোল্ড মেডেল পাই। দেহরাদুনে পড়তে গিয়েও কিন্তু ফুটবল খেলার অভ্যাসটা যেতে দিইনি। প্রচুর ইন্টার কলেজ টুর্নামেন্ট খেলেছি, গোল করেছি, করিয়েছি, এবং জিতেছি। খেলার দৌলতেই কলেজে একটু নামডাক যে হয়েছিল, অস্বীকার করব না।
বাকি রইল প্রেম, ভালোবাসার কথা। সেটায় উল্লেখযোগ্য কিছুই বলার নেই। আসলে রাইকে ভালোবাসার পর থেকে আর কারওর প্রতি কোনোদিন কোনো আগ্রহই আসেনি। ভালোবাসাতো দুর অস্ত, ভালোলাগাটুকুও নয়। একতরফা ভালবাসা জিনিসটা যে কি হয়, তখন থেকেই মোটামুটি আমি আমি বুঝতে পারি। যার সাথে দেখা হওয়া তো দূরের ব্যাপার, কথা পযর্ন্ত হয়না, তার জন্য ছিল আমার মন পাগল। প্রত্যেকটা দিনের শেষে ভাবতাম আস্তে আস্তে হয়তো ওকে ভুলে যাব, তত যেন পরেরদিন আরও বেশি করে মনে পড়ত ওকে। আগেরদিনের থেকে, আরো একটু বেশি ভালবাসতাম।
জানি, আজকের যুগে দাড়িয়ে বিষয়টা বড্ড বেমানান। কিন্তু কি আর করা যাবে বলুন, ভালোবাসা ব্যাপারটাই এমন, কোনো ছকে তাকে ফেলা যায়না।
প্রায় ছয় বছর বাইরে থাকার পর গ্র্যাজুয়েশন শেষে মনে হল এবার ঘরে ফেরা দরকার। মাস্টার্স করতে তাই ফিরে এলাম তিলোত্তমায়। রায়ান ততদিনে যাদবপুরে পি.এইচ.ডি শুরু করে দিয়েছে। কাছাকাছি কলেজ থাকায় দেখা সাক্ষাৎটাও বাড়তে থাকল, ঠিক সেই আগের মতন।
শুধু রাইয়ের সাথে যোগাযোগটা কিভাবে যেন হারিয়ে গেছিল। ফোনের কন্ট্যাক্টে, হোয়াটস্যাপে,সোশ্যাল মিডিয়ায়ে সবেতেই ওর নাম্বার ছিল, তবু আমাদের কথা হতো না।
কেন? আমারই দোষ বোধহয়। আমিই হয়তো ঠিকমতো কমিউনিকেট করে উঠতে পারিনি.....। আজ আফসোস হয় বৈকি তার জন্য।
"Meeting you was the best accident of my life,
But what if that accident happens again?
Is that the thing which poets call 'destiny'?"
এক বন্ধুর লেখা কবিতার অংশ। আমার ভীষণ প্রিয়। দুটো লাইন টুকে দিলাম। কেন? বুঝিয়ে বলছি তাহলে। এম.ডি-টাও একই রকম ভাবেই চলছিল। সেই পড়া, ফুটবল, নতুন কিছু বন্ধু, আড্ডা ইত্যাদি আরকি।
কিন্তু এম.ডি-র ফাইনাল ইয়ারে ঘটে গেল এমন একটা ঘটনা (যাকে অ্যাক্সিডেন্ট বলাই যায়) যেটা না ঘটলে হয়তো এই গল্পটাই লেখা হতো না।
ফাইনার ইয়ারে আমাদের কলেজের রীতি অনুযায়ী পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর জুনিয়ররা সিনিয়রদের ফেয়ারওয়েল দেয়। ফল বেরোলো জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে। গোল্ড পেলাম আমি এবারও, কার্ডিওলজিতে।
ফেয়ারওয়েলের দিন ঠিক করা হলো। অনুষ্ঠানের দুদিন আগে জানালো হলো আমাদের যে একটি সিনেমার প্রোমোশনে কিছু কলাকুশলি আসবেন আমদের অনুষ্ঠানে।
ফেয়ারওয়েলের দিন আসল। ২৯শে জুলাই।
ফেয়ারওয়েলে রেজাল্টের জন্য সংবর্ধনা পেয়ে স্টেজ থেকে সবে বেরিয়েছি। ব্যাকস্টেজের সিড়িতে হঠাৎ মুখোমুখি টুয়েলভ 'এ'-র রাই সেন।
৯ বছর ১মাস ১দিন পর চেনা মানুষটার সামনে ঠিক সেই চেনা অনুভূতিগুলো ফিরে পেলাম। হার্টবিট বেড়ে যাওয়া। পেট গুরুগুর। কথা হারিয়ে ফেলা। চোখ পিটপিট, ঝাপসা। সেই পুরোনো রোগের লক্ষন গুলো আরকি।
তবে এবার সামলে নিতে পারলাম। আসলে একটু বড় হয়েছি তো।
"ডঃ অর্ঘ্যজিত চক্রবর্তী। স্যার চিনতে পারছেন কি আমায় একটু কষ্ট করে?"
"তুইইই?! এখানে? কেমন আছিস? কি করছিস?"
"আরে আস্তে আস্তে, একসাথে এত প্রশ্ন। আমি এখানে এসেছি সিনেমা প্রোমোশনের জন্য। ডেবিউ ফিল্ম আমার। প্রথমবার প্লেব্যাকে গান করেছি
"আরেহ্ বাস! তার মানে তো এখন পুরো সেলিব্রিটি। দারুন!! আর বল, বিয়ে হয়ে গেছে?"
"হুর। আজ ওব্দি একটা প্রেম ঠিকঠাক করে উঠতে পারলাম না আর বিয়ে, সবে প্রথম গান বেরোচ্ছে।ওসব অনেক পরের ব্যাপার।"
কি ভাবছেন পাঠক? সেই মুখচোরা ছেলেটাই আমি কিনা? আরে হ্যাঁ, আমিই। এখন শুধু একটু কথাবার্তা বলতে পারি। মনে যা আসে, বেশি না ভেবে জিগ্যেস করে দিই। দেখেছি যে ব্যাপারটা বেশ সোজাই। আর এই প্রশ্নটাতো কম্পালসারি, অ্যাটেম্পত করতেই হতো। নাহলে যে ফেক একেবারে।
তো ফেয়ারওয়েলের দিন আমার জীবনে প্রত্যাবর্তন হলো রাইয়ের। সেইদিন অনুষ্ঠান শেষের পরেও অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল। তারপর থেকে আজ প্রায় দেড় বছর আমাদের দুজনের ব্যাস্ত কর্মজীবন সত্বেও সপ্তাহে দুদিন অন্তত দেখা করি। না কোনো ডেট না, এমনিই। এরমটা রায়ানের সাথে হলেও খুব ভাল লাগত কিন্তু সে ব্যাটা চলে গেছে ইউএসে-তে। আমি আর বাইরে কোথাও যায়নি। বাংলাতেই আছি। কেন? উমম... ধরুন না এমনিই।
গত একটা বছরে আমার জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেছে। নিজের গাড়ি কিনেছি। বড় একটা হসপিট্যালের সাথে যুক্ত হয়েছি। নয় বছর পর রাইকে জীবনে ফিরে পেয়েছি। আর সবশেষে বারো বছরের বেস্ট ফ্রেন্ড বিয়ে করবে বলে মনস্থির করেছে।
হ্যাঁ। আমার ব্যক্তিগত জীবনে লাস্ট পয়েন্টটার প্রভাব বিশাল। কারন রায়ান বলে দিয়েছে ওর বিয়েতে একসাথে আমাদের দুজনকে "কাপল" অর্থাৎ জুটি হিসাবে আসতে হবে। নাহলে পাড়াতেও ঢুকতে দেবে না আমায়।
ও হ্যাঁ; সেদিন ফেয়ারওয়েলের পর রাইয়ের সাথে দেখা হওয়ার খবরটাও প্রথম রায়ানকেই কিন্তু জানিয়েছিলাম।
এরই মাঝে একটা গোপন কথা বলে রাখি, বছরখানেক আগে ফোনে কথা বলার মাঝেই রায়ান জানিয়েছিল রাইকে ইলেভেনে দেখার পর প্রথমে ওর ভাল লাগত। কিন্তু যবে থেকে জেনেছে আমি ওকে ওরম পাগলের মত ভালবাসি, সেদিন থেকে আমার জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, মানে মন তুলে নিয়েছে আর কি। ওই কারনেই হয়তো তখন দু-তিন দিন কথা বলেনি আমার সাথে। বন্ধুত্বে কোনো প্রভাব পড়াতো দূর, আমায় কোনোদিন বুঝতে পযর্ন্ত দেয়নি। উল্টে সবসময় আমায় ভরসা জুগিয়েছে। সাধ্যমতো সাহায্য করেছে।
সত্যি, এক জীবনে অনেক কিছু শিখতে পেরেছি। অনেক কঠিন শব্দের মানে বুঝেছি যেগুলো বেশিরভাগ মানুষ বোঝেনা যেমন ধরুন বন্ধুত্ব, বা ভালোবাসা।
যাইহোক, রায়ানের চাপেই আজ ফের এক ২৯শে জুলাইতে তাই এখন আমি চুঁচুড়া ঘাটে বসে আছি রাইয়ের অপেক্ষায়। এসে পৌঁছনোর কথা ছিল তার অনেক আগে, কিন্তু যথারীতি সে লেট।
যাব গঙ্গার ওপারে। সেই যে ওই মটকা কুলফির দোকানটা মনে আছে? যেখানে নাকি প্রবাদ মতো আছে একবার কেউ গেলে, তাকে দ্বিতীয়বার ফিরে আসতেই হয়। প্রথমে একবার সংশয় ছিল এইভেবে যে দোকানটা আছে কিনা, তারপর খবর নিয়ে জানলাম তাদের মটকা কুলফি নাকি এখন রীতিমতো ভাইরাল।
সেখানেই আবার যাচ্ছি। বারো বছর পরে। প্রবাদ সত্যি করতে।
রাইয়ের টেক্সট এসছিল একটু আগে লেখা, "আর দশ মিনিট।"
রায়ানের সাথে কথা হচ্ছিল তার আগে। পাখি পড়ানোর মতন বুঝিয়ে দিয়েছে এবার আর কোনো ভুল হলে আমাকে ডাইরেক্ট এই গঙ্গাতেই বিসর্জন দিয়ে দেবে।
"কিন্তু ভাই, এইটুকুতো বোঝ যে ওরও একটা চিন্তাভাবনা আছে, চয়েস আছে। ও না ও তো বলতে পারে।"
"কি ডাক্তার হয়েছিস রে? মানুষকে বেঁচে থাকার আশা দিস, আর নিজের মধ্যে একটু কনফিডেন্স নেই? আমি লিখে দিচ্ছি, ও হ্যাঁ বলবেই। মিলিয়ে নিস। তুই শুধু এবার ক্যাঁচাস না। ব্যাস।"
এই কথার পর আর কিই বা বলতাম। ফোনটা কেটে,পকেটে রাখা গোলাপ আর আংটিটা দেখে নিলাম। ওরাও মনে হয় বেশ টেনশনে আছে।
বেশি আর কিই বা হবে। আংটি সমেত আমাকে রাই নাহয় গঙ্গায় ছুড়ে ফেলে দেবে। সে সাঁতার কেটে নেব। অনেক ছোটবেলায় শিখেছিলাম ঠিকই কিন্তু সাতার তো কেউ ভোলেনা।
ভাবছি প্রোপোজ্ করার সময় এই গল্পটাও পড়িয়ে দেব। নাহলে একসাথে এত কথা বলতে গেলে পাক্কা সব কেঁচিয়ে ফেলব। তারপর যা হবার হবে। আপাতত চার কাপ চায়ের দামটা মিটিয়ে আসি।
পার্স খুলতেই হঠাৎ চোখে পড়ল টুয়েলভথের ফেয়ারওয়েলের দিন রাইয়ের ফোন থেকে তোলা আমাদের সেই সেলফিটা। এই ছবিটার মতো যত্ন করে কিচ্ছু বোধহয় রাখিনি আজ পযর্ন্ত।
আচ্ছা, আপনাদের মনে আছে ফেয়ারওয়েলের দিন বর্ষাকালের মধ্যেও আমরা কাশফুল দেখেছিলাম? অনেকদিন পরে একদিন বোটানি নিয়ে পড়া এক বন্ধুকে ব্যাপারটা বলায়, সে উত্তর দিয়েছিল যে ওইগুলো যেমন আগে ফুটেছে, প্রপার শরত আসার অনেক আগেই হয়তো ঝড়েও যাবে। দুর্গাপূজোয় দেখতেও পাবিনা।
কথাটা ভাবলে মনে হয় যে হয়তো শেষ ওব্দি আমাদের জীবনে সব কিছুই পূর্বনির্ধারিত। আমরা জানিনা শুধু। সঠিক সময়ের সঠিক জিনিসটা আমাদের জন্যে দাড়িয়ে আছে যদি আমরা সঠিক রাস্তাটায় যাই। আর অপেক্ষা করাটা খুব প্রয়োজন। নাহলে ওই কাশফুলেদের মতনই অকালে ঝড়ে যেতে হয়।
আমি তো অপেক্ষা করলাম এতো বছর। একবার হারিয়ে গিয়েও যখন ফের তাকে খুঁজে পেয়েছি, মানে হয়তো রাস্তাটাও ঠিকই বেছেছিলাম। এরপরে আর বেশি ভেবে লাভ নেই। মটকা কুলফিটাতো খাওয়া যাবে। সেবারে তো আয়েশ করে খেতেও পারিনি।
ব্যাস। গল্প এটুকুই। এরপরে যে কি হবে আমি নিজেও জানিনা।
বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। রাইয়ের নিলরঙা স্কুটিটাকে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখছি। এবার উঠতে হবে।
ইলেভেনে রাইয়ের সাথে দেখা হওয়ার দিন, মাস্টার্সের ফেয়ারওয়েলের দিনও কিন্তু এরমই শহরজুড়ে বৃষ্টি নেমেছিল..........।
xxx
(স্কুলছুটির চুড়মুড়, রাইয়ের মায়াবী চোখ, মটকা কুলফি, ও ভালবাসার অনুভূতি বাদে এ গল্পের সবই কাল্পনিক)