১
কার?
হাতঘড়ি জানান দিচ্ছে, সময়ে এখন ভোর চারটে। তিলোত্তমা কলকাতার ঘুম এখনও ভাঙেনি। বাবুঘাট চত্বরটা এই মুহুর্তে একদমই ফাকা। কোনো জনমানুষের চিহ্ন নেই বললেই চলে। সূর্যদেবের দেখা পেতেও ঢের দেরি। হিমেল বাতাস মাঝে মাঝেই একটা করে ঝাপটা দিয়ে দুঃখবিলাসী গল্প শোনানোর খুব করে চেষ্টা করছে।
আর অনেক দূরে থেকে, একটা নৌকাকে আসতে দেখা যাচ্ছে...।
উমা বাবুঘাটের একটা সিড়িতে একা বসে আছে। গত কয়েক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া একের পর এক ঘটনা নিজের মনে বার বার সাজানোর চেষ্টা করছে। তবে চেষ্টা করেও সে ঠিকঠাক সব কিছু সাজাতে পারছেনা।
সবকিছুই কেমন ঘেঁটে যাচ্ছে। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না।
২
রাত তিনটে নাগাদ হোস্টেলে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এল অয়ন। আরও একটা রাত ঘুম হলো না। আজ যদিও ঘুমানোর উপায়ও ছিল না।
এই কদিনে আস্তে আস্তে অয়নের শরীরটা ভেঙে পড়ছে। শেষ কয়েক রাত ঘুম নেই। চেনা ডিপ্রেশনের গল্পটা আবার যেন ফিরে ফিরে আসছে। তফাত শুধু এটাতেই এবার অয়ন তার পেশেন্ট সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তার কেস হিস্ট্রি, ডায়গ্নসিস, রেমেডি, সবই জানা।
তাও সে চিকিৎসাটা করে উঠতে পারছে না।
জীবনের গল্পগুলো যে কেন এরকম হয় বুঝে উঠতে পারে না অয়ন। জীবন হঠাৎ করে, একদম আচমকা স্বপ্ন দেখায়, সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দেয়, এবং অচিরেই সে সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে গুড়িয়েও দেয়। কি অদ্ভুত, তাই না?
অয়ন বুঝে উঠতে পারে না জীবনের এই খেলার ধরন। সে তাই হারতে থাকে এই খেলায়।
খুব করে তার ইচ্ছে হচ্ছে একটি বার উমার সাথে কথা বলার.....
অন্তত একবার যদি সে সাহস করে ডায়ালপ্যাডে ওই নাম্বারটায় কল করতে পারত........
৩
যে নৌকাটাকে আসতে দেখা যাচ্ছিল হাওড়ার দিক থেকে, সেটি এখন বাবুঘাটের সামনে প্রায় এসে গেছে...
উমার ভীষন করে একবার কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কাঁদলে নাকি হালকা হওয়া যায়। তা সেই চোখের জলেরও আজ দেখা নেই। একসময় যাদের নিত্য বিচরণ ছিল ওর গালে বা কপালে, আজ দুর্দিনে তারাও বিমুখ।
.....
আজ দোলযাত্রা।
সব ঠিক থাকলে উমার ও আজই ঘরে ফেরার কথা ছিল।
কিন্তু বলছি না, কোনো কিছুই ঠিক নেই।
গতকাল সকাল থেকে উমার বাবা বুকে হঠাৎই বেশ ব্যাথা শুরু হয়। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন যে হয়তো হজমজনিত কোনো কারণে এই সমস্যা, তাই গুরুত্ব দেননি। তবে বেশ কিছুটা সময় যাওয়ার পরেও যখন তার ব্যাথা কমার বদলে বাড়তে থাকে, উমার মা ভিষন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। উমার কাকার সাথে ফোনে কথা তারা উমার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করাই সমীচীন বোধ করেছিলেন।
বেশ কয়েক ঘন্টা পরে জানা যায় যে না, কোনো হার্ট অ্যাটাক হয়নি উমার বাবার। তবে সমস্ত টেস্ট করে এটাও সামনে আসে যে দুটি আর্টারিতে সত্তর শতাংশের বেশি এবং একটিতে ৪৫ শতাংশ ব্লকেজ পাওয়া গেছে। বিপদের সম্ভাবনা প্রবল। খুব তারাতাড়ি অপারেশন করাটা প্রয়োজন।
আজ উমার বাবার ওপেন হার্ট বাইপাস সার্জারি অপারেশন...
উমা সব জানার পরে কাল রাতেই আপতকালীন ফ্লাইটে কলকাতায় চলে এসেছে।
৪
ভারতের সঙ্গীতনগরী গোয়ালিয়রে সূর্য উঠতে এখনও ঢের দেরি। তারই মধ্যে অয়নের ক্যাব শহরের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।
দোলে কলকাতা যাওয়ার কোনো প্ল্যান অয়নের এইবার ছিল না। মাস দেড়েক আগে উমাই তাকে রাজি করায় কলকাতা যাওয়ার জন্য।
হ্যাঁ। পরিস্থিতি তখন প্রায় পুরোটাই আলাদা ছিল।
গাড়িতে বসে অয়নের মাথায় ভাসতে থাকে উমার সাথে প্রথম দেখা হওয়ার মুহুর্তে থেকে শেষ যেদিন তার সাথে কথা হয়েছিল, সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ।
গত একটা বছরে দুজনে প্রায় একে অপরের অবলম্বন হয়ে উঠেছিল। একসাথে কখনও আগ্রা, কখনও দিল্লি, বা কখনও গোয়ালিয়র, অনেক জায়গাই সাক্ষী থেকেছে ওদের ভালোবাসার। সাথে উৎসব বিশেষে কলকাতা যাত্রা তো আছেই। পড়াশুনা, ক্যারিয়ারও এগোচ্ছিল দুজনের ভীষন মশ্রিন ভাবে।
সব মিলিয়ে জীবনটা প্রায় স্বপ্নের মতনই লাগছিল ওদের।
আর এই স্বপ্ন শ্বব্দটার সাথে জীবনের বোধহয় প্রবল কোনো দন্দ্ব আছে।
মাস দেড়েক আগেও সব কিছু বেশ ভালই ছিল। সুন্দর দোলের প্ল্যান-ট্যান করল উমা। অয়ন কেও সেই রাজি করিয়েছিল কলকাতা যাওয়ার জন্য। আর তালটা কাটল ঠিক এরপরেই।
কলেজ ও পড়াশুনার চাপটা হঠাৎ করে বাড়তে থাকল দুই তরফে। ফিকে হতে লাগল যোগাযোগ। টেক্সট ডেলিভার্ড হয়ে পড়ে থাকতে লাগল আর ফোন রিং হয়ে বাজতে থাকত আনমনে।
ক্রমশ গাঢ় হলো ভুল বোঝাবুঝি।
তারপরে একদিন ফোনে কথা হল দুজনের। কথা বলতে কিছুই তেমন হয়নি। শুধু অভিমানে মোড়ানো নিরবতা বইছিল ফোনের দুই প্রান্তে।
সেইদিনই শেষবার কথা হয়েছিল দুজনের।
তাও প্রায় তিন সপ্তাহ আগে...।
ফোনটারও কি কষ্ট হয়েছিল সেই রাতে?
৫
- অ দিদিমুণি, অনেকক্ষণ ধইরয়া দেখি একলা বসে আইচেন, কুথাও যায়েন নাকি? উপারে যাইবেন? বউনি করতাম, খরচা কম হইত কিন্ত....
বাবুঘাট তথা কলকাতা ছুটির দিনে ঢিমেতালে ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে। গাড়ি ঘোড়ার চলাচল আস্তে আস্তে বাড়ছে...। দোলের কারনে বেশ কিছু মানুষ রং, আবির, পলাশের মালা ইত্যাদি পসরা সাজিয়ে বসেছেন ঘাট চত্বরেই।
উমার বাবার অপারেশন শুরু হবে সকাল সাতটায়। বাইরে যতই রোদের দেখা মিলুক, উমার মনের ভেতরে ঝড় থামার কোন লক্ষণ নেই।
উমা ভাবল একবার যদি অয়নকে ফোন করা যায়, সব অভিমান, ইগো সরিয়ে রেখে... আজ তো ওর কলকাতায় ফেরারও কথা। আসবে কি আর?
কিন্তু বিধি বাম! মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে উমা দেখে সেটায় একটুও চার্জ নেই। পুরো ডেড হয়ে গেছে।
মাঝির ডাক শুনে উমা এগিয়ে গেল নৌকাটার দিকে। ছোটবেলায় সে বাবার সাথে প্রতি রবিবার বিকেলে এই বাবুঘাট থেকে নৌকা করে গঙ্গা পারাপার করত। তার ভীষন ভাল লাগত নৌকায় চড়তে।
আজ অনেকদিন পর তার ইচ্ছে হল একটিবার নৌকায় চড়তে। যদি তাতে একটু হালকা হওয়া যায়...
- চলো।
বয়স্ক মাঝিভাই গান গুনগুন করতে করতে নৌকা বইয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। ভারি সুন্দর সুর। এই গানগুলোকেই ভাটিয়ালি গান বলে না?
- কোথায় যায়েন দিদিভাই উপারে?
- কোথাও যাওয়ার নেই গো মাঝিভাই। এমনি মন ভালো করার জন্য উঠলাম নৌকায়।
- তা, এই কচি বয়সে আবার মন টন খারাপ হয় ক্যান হে?
- কে তোমার বলল বলো দেখি যে কচি বয়সে মন খারাপ হতে পারেনা?
হেসে জিজ্ঞেস করল উমা।
তাও প্রায় কদিন পর সে হাসল যেন?
- তা কি কারনে তুমার মন খারাপ শোনা যায় নাকি?
উমার খারাপ লাগছিল না তার সাথে কথা বলতে। সে তাই অচেনা মানুষটিকে এরপর একেক করে বলতে থাকে তার বাবার অসুস্থতা, অয়নের সাথে দূরত্ব, ইত্যাদির কথা।
-দিদিভাই, একটা কইথ্যা বলি। এই যে শহরটাইতে আছো জানো, এই শহরটাইর একটা প্রান আইছে। আমি মুনে কোরিনা, এই পৃথিবীর কোনো শহর এর মইতো সুন্দর হোতে পারে। ভীষন ইকটা আবেগ আছে এই শহরটাতে।
এ কাউকে বেশিদিন দুঃখে রাখে না। দেখ, আমি জানিনা ক্যান, আমার মন বইলচে, আজ রঙের উৎসবের দিনে, তুমি তুমার জীবনের হারানো রঙগুইলো আবার ফিরে পাইবে দেখো।
মিলিয়ে নিও আমার কথাগুইলা.....
মাঝিভাই এক নিঃশ্বাসে বলে চলে।
ফের হাসে উমা। তবে এটা বোধহয় শুধুই হতাশা ও অনিশ্চয়তায় ভরা...
৬
দমদম এয়ারপোর্টে নামা ইস্তক অনেকবার উমাকে ফোনে ট্রাই করছে অয়ন। প্রতিবারই সুইচ্ড অফ শোনাচ্ছে। ১১টার সময় ফোন বন্ধ থাকায় অয়ন বেশ চিন্তিত হল। আজ তো উমার কলকাতাতেই থাকার কথা। ও কি আসেনি তাহলে?
ইগো শেষ পযর্ন্ত হারলো তাহলে। অভিমানটা এখনও একটু বেচে আছে যদিও, তবে ওটাকে এই মুহূর্তে পাত্তা না দিলেও হবে। কিন্তু এখন কি করণীয়? মাথা আবার ঘেটে যাচ্ছে অয়নের...
কি মনে করে অয়ন উমার মা কে ফোন করল। উমার মা অয়নের নাম্বার দেখে ফোনটা ধরলেন। অয়ন তারপর সমস্ত কিছু জানতে পারল। জানল, এই মুহুর্তে উমার বাবার অপারেশন চলছে।
বাড়িতে ঢুকে তৎক্ষণাৎ সে রওনা দিল হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। তার মাকে সে আসতে আসতেই ফোনে সবটা জানিয়ে দিয়েছিল।
৭
হাওয়া অফিসের যতই পূর্বাভাস থাকুক দোলের দিন ঝড়, বৃষ্টির, আজ কোনোটারই দেখা নেই। বরং এখন আকাশের সমস্ত মেঘ কেটে, শেষ বসন্তের মিষ্টি একটা রোদ দেখা দিয়েছে।
আমাদের গল্পের নায়ক নায়িকার জীবনেও তাই।
উমার বাবার অপারেশন সফলভাবে শেষ হয়েছে প্রায় ১টা নাগাদ। দুপুর ৩টে নাগাদ তাকে জেনারেল বেডে শিফট করা হয়েছে। ডাক্তারবাবু জানিয়ে দিয়েছেন চিন্তার ও ভয়ের আর কোনো কারণ নেই।
অয়ন ও উমা এই মুহুর্তে দাড়িয়ে আছে প্রিন্সেপ ঘাটে।
ঘড়িতে এখন প্রায় ৪টে বাজে। উমাকে না বলে হঠাৎ অয়ন কোথাও চলে গেছিল। সে ফিরল হাতে একটি পলাশ ফুলের মালা নিয়ে। সেটি উমার গলায় সে পড়িয়ে দিল।
উমা আবার হাসল।
- জানো তো, পলাশ ফোটার আগে কিন্তু শীতকাল থাকে, তখন কোনো গাছে ফুল থাকা তো দূরের কথা... একটা পাতাও থাকেনা।
- হুমম... তিন সপ্তাহে ফিল্ম থেকে ফিলোসফির লাইনে ডাইরেক্ট... দারুণ ব্যাপার তোহ!
উমার গালে আবির মাখিয়ে দিতে দিতে হেসে জবাব দেয় অয়ন।
শহর যেন তার হারানো রঙ ফিরে পেল.....
.....
গঙ্গার পার দিয়ে হাটতে থাকে উমা এবং অয়ন। সকালের সেই মাঝিকে খুঁজতে উমা বাবুঘাটেও একবার গেছিল, দেখা পায়নি।
ভালো মানুষদের দেখা বোধহয় আজকাল কমই পাওয়া যায়। আর তাই, পেলে তাদের সহজে ছেড়ে যেতে নেই। যেমন ছেড়ে যেতে দেয়নি অয়ন ও উমা। ভুল বোঝাবুঝি, মন কষাকষি, রাগারাগি, সব কিছুকে ফের একবার হারিয়ে জয়ী হল "ভালবাসা"। শব্দটা খুব দামি , খুব তার ওজন। তবে মর্যাদা দিতে পারলে এই শব্দটাও ঠিক জড়িয়ে আঁকড়ে ধরতে জানে।
আর এইসব কিছু, সব অভিমানের গল্পগুলো, সবার থেকে লুকিয়ে রাখা কাঁন্নাগুলো, আর হেরে যেতে যেতেও ফিরে আসার যুদ্ধে জয়ের শেষে হাসিগুলো...
শহর কলকাতা সাক্ষী থাকে সবেরই।
যার নামই তিলোত্তমা, সে তো আর ভালোবাসাকে মিথ্যে হতে দিতে পারেনা কোনোভাবেই...
আজ বসন্তের শেষ লগ্নে, আমরা অয়ন ও উমাকে এখানেই ছেড়ে দিই। শুধু দোলের দিন এই লেখা শেষ করছি যখন, এটুকু বলে যাই যে, 'ভালোবাসাকে' বাঁচিয়ে রাখতে অয়ন ও উমা আবার ফিরবে। আজ নয়, কাল বা পরশুও হয়তো নয়, তবে এই কলমে তাদের নিয়ে লেখা আবার আসবে।
( পলাশের মালা, মাঝিভাই-এর গান আর ভালবাসার অনুভূতি বাদ দিয়ে এই গল্পের সবই কাল্পনিক )